লিভারকে ‘ডিটক্স’ বা বিষমুক্ত করার কথা বলে সম্প্রতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে কফি এনেমা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই পদ্ধতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চললেও, এর ফলে মারাত্মক জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন অনেকে। এই প্রক্রিয়ার ঝুঁকি ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন সিলেট ইবনে সিনা হাসপাতালের কনসালট্যান্ট সার্জন ডা. রেজা আহমদ।

সাধারণত অন্ত্র পরিষ্কার করার জন্য চিকিৎসকরা নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে এনেমা ব্যবহারের পরামর্শ দেন, যা ফার্মেসিতে কিনতে পাওয়া যায়। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যবহৃত কোনো এনেমায় কফি থাকে না। বর্তমানে অনেকে শরীর থেকে টক্সিন বের করার উদ্দেশ্যে বাড়িতেই পায়ুপথে কফি প্রবেশ করাচ্ছেন, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

ডা. রেজা আহমদ জানান, কফি এনেমার ক্ষতিকর প্রভাব কেবল বাংলাদেশে নয়, বিশ্বজুড়ে পরিলক্ষিত হয়েছে। তিনি বলেন, "কফি এনেমা গ্রহণের কারণে দুজন ব্যক্তির মৃত্যুর খবরও প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্রে।"

যদিও মৃত্যুঝুঁকি কম, তবে এর ফলে সৃষ্ট জটিলতা একজন ব্যক্তিকে চরম ভোগান্তির মুখে ফেলতে পারে। এর প্রধান ঝুঁকিগুলোর মধ্যে রয়েছে মারাত্মক পানিশূন্যতা এবং লবণের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, কারণ এর ফলে অন্ত্রের প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান বেরিয়ে যায়। এছাড়া পায়ুপথ, মলদ্বার বা অন্ত্রে আঘাত লেগে প্রদাহ হতে পারে। গরম কফি ব্যবহারের ফলে অন্ত্র পুড়ে গিয়ে ‘স্ক্যাল্ড’ হতে পারে, যা মলদ্বার সরু করে দেয় (রেক্টাল স্ট্রিকচার)।

বারবার এই পদ্ধতি অবলম্বন করলে মলদ্বারের পেশির স্বাভাবিক ক্ষমতা নষ্ট হয়ে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। এছাড়া বাইরে থেকে জীবাণু প্রবেশ করে রক্তে সংক্রমণ বা সেপটিসেমিয়া হওয়ার ঝুঁকি থাকে। পাশাপাশি অন্ত্রের উপকারী জীবাণু বেরিয়ে যাওয়ায় ক্ষতিকর জীবাণুর আক্রমণ সহজ হয়। কফি পান করার চেয়ে পায়ুপথে নিলে রক্তে ক্যাফেইন অনেক বেশি শোষিত হয়, ফলে মাথাব্যথা, বুক ধড়ফড়ানি ও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

লিভার ডিটক্সের ক্ষেত্রে কোনো শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও এটি জনপ্রিয় হওয়ার কিছু কারণ রয়েছে। ক্যাফেইনের প্রভাবে সাময়িক সতেজতা, মলত্যাগের স্বস্তি, পুরুষের ক্ষেত্রে প্রোস্টেট গ্রন্থিতে চাপের কারণে ভালো লাগা এবং মানসিক বিশ্বাসের কারণে অনেকে একে কার্যকর মনে করেন।

চিকিৎসকের মতে, কফি এনেমা লিভার ডিটক্স করতে পারে না। শরীর বা কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আলাদা করে ডিটক্স করার প্রয়োজন নেই, কারণ লিভার ও কিডনি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় শরীর থেকে ক্ষতিকর পদার্থ বের করে দেয়। এমনকি লিভার বা কিডনি বিকল হলেও এই ধরনের ঘরোয়া ডিটক্স পদ্ধতি কোনো উপকারে আসে না, বরং ঝুঁকি বাড়ায়।