ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ক্রমেই বড় হচ্ছে বিরোধী শিবির। এবার তার নেতৃত্বের ওপর একসঙ্গে অনাস্থা জানিয়েছে ছয় নর্ডিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন ও ফারো দ্বীপপুঞ্জ জানিয়েছে, ইনফান্তিনোর পাশাপাশি ফিফার সর্বোচ্চ পর্যায়ের পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপরও তাদের আস্থা নেই।
রোববার ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কিতে বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতিটি দিয়েছে ছয় অ্যাসোসিয়েশন। একই সঙ্গে ইনফান্তিনোর পদত্যাগের দাবি তোলা উয়েফা, এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন এবং কনকাকাফের অবস্থানের প্রতিও সমর্থন জানিয়েছে তারা।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ফিফার সভাপতির ওপর আস্থা হারিয়েছে ছয় নর্ডিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। সংস্থাটির সর্বোচ্চ পর্যায়ের পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়েও আমরা উদ্বিগ্ন।’
ইনফান্তিনোর বিতর্কিত ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ প্রকল্প থেকেই বর্তমান সংকটের সূত্রপাত। ওই পরিকল্পনায় বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক স্বত্ব নিয়ন্ত্রণকারী একটি নতুন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যালঘু মালিকানা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
পরিকল্পনাটি নিয়ে সদস্য অ্যাসোসিয়েশন ও আঞ্চলিক কনফেডারেশনগুলোর সঙ্গে যথেষ্ট আলোচনা করা হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে। বিশ্বজুড়ে প্রবল বিরোধিতার মুখে শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাতিল করে ফিফা। পরিকল্পনা পরিচালনায় ভুল হওয়ার কথা স্বীকার করে সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোর কাছে ক্ষমাও চায় বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
তবে শুধু পরিকল্পনা বাতিল করাকেই যথেষ্ট মনে করছে না নর্ডিক অ্যাসোসিয়েশনগুলো। ভবিষ্যতে ফিফার পরিচালনা কিংবা কোনো প্রতিযোগিতার মালিকানায় বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হবে না, এমন বাধ্যতামূলক নিশ্চয়তা চেয়েছে তারা।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ফিফার পরিচালনা বা প্রতিযোগিতা আর কখনো বেসরকারি মালিকানার জন্য উন্মুক্ত করা হবে না, আমরা সেই বাধ্যতামূলক নিশ্চয়তা প্রত্যাশা করছি।’
পুরো ঘটনা নিয়ে স্বাধীন বাহ্যিক তদন্তের দাবিও তুলেছে ছয় অ্যাসোসিয়েশন। তাদের মতে, প্রস্তাবটি কীভাবে তৈরি হয়েছিল, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় কারা যুক্ত ছিলেন এবং সদস্যদের অন্ধকারে রাখা হয়েছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ফিফার পরিচালন কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন পর্যালোচনা চেয়েছে তারা। ২০১৬ সালে সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণের সময় যে স্বাধীনতা, ক্ষমতার ভারসাম্য, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বর্তমান কাঠামোতে সেগুলো কার্যকর রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছে নর্ডিক জোট।
ইনফান্তিনোর ওপর চাপ বাড়ানোর ক্ষেত্রে আরও এক ধাপ এগিয়েছে ডেনমার্ক। দেশটির ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, ২০২৭ সালের ফিফা সভাপতি নির্বাচনে ইনফান্তিনোর বিপরীতে একজন গ্রহণযোগ্য প্রার্থী খুঁজবে তারা।
আগামী বছরের মার্চে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে চতুর্থ মেয়াদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান ইনফান্তিনো। জয়ী হলে ২০৩১ সাল পর্যন্ত ফিফার দায়িত্বে থাকবেন তিনি। তবে বিশ্ব ফুটবলের ছয়টি মহাদেশীয় কনফেডারেশনের মধ্যে উয়েফা, এএফসি ও কনকাকাফ ইতিমধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ইনফান্তিনো স্বেচ্ছায় সরে না দাঁড়ালে তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনার সম্ভাবনাও আলোচনা করছে তারা।
ফিফার ২১১ সদস্যের অন্তত এক-পঞ্চমাংশ, অর্থাৎ ৪৩টি অ্যাসোসিয়েশন লিখিত আবেদন করলে অসাধারণ কংগ্রেস ডাকতে বাধ্য হবে ফিফা কাউন্সিল। আবেদন পাওয়ার তিন মাসের মধ্যে সেই কংগ্রেস আয়োজন করতে হবে। তবে দায়িত্বে থাকা কোনো সভাপতিকে অপসারণের জন্য অনাস্থা ভোটের নির্দিষ্ট বিধান ফিফার গঠনতন্ত্রে নেই। ফিফার ইতিহাসেও কোনো সভাপতির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনাস্থা ভোট অনুষ্ঠিত হয়নি।
বিরোধিতা বাড়লেও ইনফান্তিনোর সমর্থন পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন এখনো তার পাশে রয়েছে। কাতার ও ২০৩০ বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক মরক্কোসহ ছয় আরব অ্যাসোসিয়েশনও সম্প্রতি তার প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছে।
তারপরও ছয় নর্ডিক অ্যাসোসিয়েশনের সম্মিলিত অবস্থান ইনফান্তিনোর জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা। বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি দেশ সমর্থন প্রত্যাহার করলেও এবার একটি অঞ্চলের ছয় সদস্য এক মঞ্চ থেকে তাঁর নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারানোর ঘোষণা দিল।