প্রায় ৬ মিলিয়ন বা ৬০ লাখ বাংলাদেশি নাগরিকের জীবনবৃত্তান্ত তথা সিভি ডার্ক ওয়েবে বিক্রির জন্য নিলামে ডেকেছে একটি হ্যাকারগোষ্ঠী। এসব সিভি এক হাজার মার্কিন ডলারের বিনিময়ে বিক্রি করা হবে বলে জানিয়েছে ‘ম্যাডর্যাক্স’ পরিচয় দেওয়া ওই হ্যাকারগোষ্ঠী। তাদের দাবি, বাংলাদেশি ক্যারিয়ার প্ল্যাটফর্ম ‘বিডি জবস’ এর ডাটাবেজ থেকে সিভিগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে।
নিজেদের দাবির স্বপক্ষে, কয়েকটি সিভির নমুনাও প্রকাশ করেছে ম্যাডর্যাক্স। তবে মুক্তকণ্ঠের কাছে নিজেদের ডাটাবেজ সুরক্ষিত থাকার দাবি করেছেন বিডি জবসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর।
রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুর ১২টার দিকে ‘ডার্ক ফোরামস ডট আর ইউ’ নামক একটি ওয়েবসাইটে সিভি বিক্রির পোস্ট করে ম্যাডর্যাক্স।
হ্যাকার গোষ্ঠীটির দাবি, তাদের কাছে ৬০ লাখ বাংলাদেশি নাগরিকের সিভি রয়েছে। এই সিভিগুলো বিডি জবস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয় পোস্টে। মাত্র পাঁচজন ব্যক্তির কাছে এসব সিভি বিক্রি করা হবে। এ জন্য এক হাজার মার্কিন ডলার করে দাম চাওয়া হয়েছে। সিভিগুলোতে বিডি জবস ব্যবহারকারীদের নাম, ফোন নম্বর, ঠিকানা, প্রশিক্ষণের তথ্য, একাডেমিক তথ্য, পেশাগত অভিজ্ঞতাসহ বিভিন্ন ধরনের তথ্য রয়েছে।
নিজেদের দাবির স্বপক্ষে, নমুনা হিসেবে ১৪৮টি সিভি প্রকাশ করেছে ম্যাডর্যাক্স। এগুলো বিনামূল্যেই ডাউনলোড করা যাচ্ছে। মুক্তকণ্ঠের পক্ষ থেকে সেগুলো ডাউনলোড এবং বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, সবগুলো সিভির ধরন একই এবং সেগুলোতে বিডি জবসের সিভি টেমপ্লেটের (ফরম্যাট) সাথে সাদৃশ্য আছে। ১৪৮টি সিভির মধ্যে নারী ও পুরুষ উভয়েই রয়েছেন। সিভিগুলোতে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত জীবনের প্রায় সকল তথ্যই রয়েছে।
নমুনায় থাকা সিভির সূত্রে অন্তত তিন জন ব্যক্তির সাথে কথা বলেছে মুক্তকণ্ঠ। তাদের সাথে সিভির তথ্য মিলে যায় এবং তারা জানিয়েছেন যে, বিডি জবসে তাদের সিভি রয়েছে। তবে বিডি জবস থেকে সিভির তথ্য অন্য কোথাও যাওয়ার বিষয়ে এখনও তারা জানেন না। বিডি জবসের পক্ষ থেকেও তাদেরকে কিছু জানানো হয়নি বলেও উল্লেখ করেন তারা।
যদিও নিজেদের ডাটাবেজ থেকে সিভি হ্যাকারদের কাছে যাওয়ার দাবি নাকচ করেছে বিডি জবস। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের ডাটাবেইজ ‘ব্রিচ’ (হ্যাকারদের অনুপ্রবেশ) হয়েছে বলে এখনও জানি না। এমনটা হলে সবার আগে আমরাই জানতাম। আর অনেক চাকরিদাতা বিডি জবসে অর্থ দিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের সিভি কেনেন। সেভাবে কোনো সিভি হ্যাকারদের কাছে যেতে পারে। আবার অনেকেই এখন নিজেদের সিভি বিনামূল্যে লিংকড ইনেও রাখেন। সেখান থেকেও সিভির তথ্য অন্য কোথাও যেতে পারে।’
ফাহিম মাশরুর আরও বলেন, ‘আমাদের নাম ব্যবহার করলে অনেকের আয় রোজগার ভালো হয়। তেমনি কেউ হয়তো আমাদের নাম ব্যবহার করে এসব করছে।’
যদিও ফাহিম মাশরুরের এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও এথিক্যাল হ্যাকাররা। এথিক্যাল হ্যাকার ও সাইবার ৭১ এর পরিচালক আবদুল্লাহ আল জাবের মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘৬০ লাখ ব্যবহারকারীর সিভি বিডি জবস থেকে কেউ কিনে, সেটিকে আবার ডার্ক ওয়েবে বিক্রি করবে; বিষয়টা এত সরল না। আবার লিংকড ইন বা এ ধরনের কোনো প্ল্যাটফর্ম থেকে স্ক্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে ৬০ লাখ ব্যবহারকারীর মতো বিশাল ডাটাবেজ তৈরি করে ডার্ক ওয়েবে বিক্রি করা বাস্তবসম্মত না। তাছাড়া লিংকড ইন-এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের থেকে নিশ্চই জোরালো।’
নাগরিকদের তথ্য অনাকাঙ্ক্ষিত কারও দখলে যাওয়া উদ্বেগজনক বলেও সতর্ক করেন আবদুল্লাহ আল জাবের। তিনি বলেন, ‘আপনার সিভিতে কী নেই? আপনার পুরো নাম, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর, ইমেইল অ্যাড্রেস, কোথায় কোথায় পড়াশোনা করেছেন, কোথায় কোথায় চাকরি করেছেন-সব কিছু। আপনার এই সংবেদনশীল ডেটা এখন সরাসরি সাইবার অপরাধীদের হাতের মুঠোয়।’
আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, ‘আপনার এই তথ্যগুলো দিয়ে তারা চাইলেই আপনার নামে ফেক আইডেন্টিটি তৈরি করতে পারে, ব্যাংক বা ফাইন্যান্সিয়াল জালিয়াতি করতে পারে, স্প্যামিং বা ফিশিং অ্যাটাক চালাতে পারে। এমনকি আপনার নাম ও ঠিকানা ব্যবহার করে এমন কোনো ভয়ংকর অপরাধমূলক কাজ করতে পারে যার কিছুই আপনি জানেন না। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের ডেটা সিকিউরিটির আজ এই বেহাল দশা কেন? বিডি জবস কি আদৌ এর কোনো জবাবদিহি করবে?’
ফোনে বা ইমেইল অপরিচিত কোন মাধ্যম থেকে আসা কল, লিংক বা মেসেজ সম্পর্কে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকারও পরামর্শ দিয়েছেন জাবের। অপরিচিত কোনো মাধ্যম থেকে আসা কোনো লিংকে ক্লিক বা ইমেইলের কোনো এটাচমেন্ট ডাউনলোডে সতর্ক করেছেন তিনি।