ঠাকুরগাঁও জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। জেলার মোট ৯৯৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৪৮টিতেই কোনো প্রধান শিক্ষক নেই। ফলে একযোগে একাধিক শ্রেণি পরিচালনা করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন শিক্ষকরা, যা শিশুদের স্বাভাবিক পাঠদান প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, একজন বা দুজন শিক্ষককে পুরো স্কুলের তিন থেকে চারটি শ্রেণি একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা ও বিশেষ যত্ন বিঘ্নিত হচ্ছে। পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষকদের দাপ্তরিক কাজ সামলাতে হচ্ছে, যা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে নাজুক করে তুলেছে।

নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালা অনুযায়ী ৩৫ শতাংশ প্রধান শিক্ষক সরাসরি নিয়োগ পান এবং ৬৫ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে আসেন। তবে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেকেই অবসরে গেছেন এবং ২০০৯ সাল থেকে আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে পদোন্নতি বন্ধ থাকায় শূন্যপদগুলো পূরণ করা যাচ্ছে না। এছাড়া সরাসরি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় গাফিলতির অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘ সময় পদোন্নতি বন্ধ থাকায় শিক্ষকদের মধ্যেও পাঠদানের আগ্রহ কমছে।

পৌরশহরের হাজীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাজমুন আক্তার বলেন, "আমাদের বিদ্যালয়ে আমি কোনো দিন হেড স্যারকে দেখিনি। হেড স্যার না থাকায় আমাদের সমস্যা হয়। আমাদের বিদ্যালয়ে একজন হেড স্যার থাকলে আমাদের পড়ালেখা আরও ভালো হতো।"

আরেক শিক্ষার্থী আকাশ বলেন, "আমাদের একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আছেন। তিনি ক্লাস নেবেন না অফিস সামলাবেন, তা বুঝি না। মাঝে মাঝে ক্লাসে আসেন, অল্প পড়িয়ে চলে যান। আমরা এর সমাধান চাই।"

অভিভাবক জীবন হক বলেন, "ঠাকুরগাঁও জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। এসব বিদ্যালয়ে মাত্র চারজন শিক্ষকের পক্ষে প্রতিটি ক্লাস পরিচালনা করা কষ্টকর। বিদ্যালয়ের লেখাপড়ার মানোন্নয়নের জন্য দ্রুত শিক্ষক-স্বল্পতা দূর করা দরকার।"

বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি ঠাকুরগাঁও জেলার সাধারণ সম্পাদক জুলফিকার রহমান বলেন, "যারা ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে সহকারী শিক্ষক পদে চাকরি করছেন, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাদের পদোন্নতি না দিয়ে নতুনদের প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে।"

তিনি আরও বলেন, "আইনি জটিলতার কারণে চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান ব্যাহত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সদিচ্ছা ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এরই মধ্যে প্রধান শিক্ষক নিয়োগের নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হওয়ায় সহকারী শিক্ষকরা হতাশ হয়েছেন। অবিলম্বে এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বাতিল করে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে শতভাগ পদোন্নতি দেওয়া উচিত।"

সদর নারগুন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আলী আসলাম বলেন, "চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের কথা অন্য শিক্ষকরা মানতে চান না। কারণ সবাই একই পদমর্যাদার সহকারী শিক্ষক হিসেবে গণ্য। এতে করে পাঠদান ব্যাহত হয় এবং প্রশাসনিক কাজেও জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। এই সমস্যার সমাধানে দ্রুত প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির ব্যবস্থা করা জরুরি।"

পৌর শহরের দোয়েল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলতাফুর রহমান বলেন, "মামলাজনিত কারণে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। এছাড়া নতুনভাবে পদোন্নতিও বন্ধ। প্রধান শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার মান চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।"

সহকারী শিক্ষক নাজমা পারভীন বলেন, "প্রধান শিক্ষক না থাকায় পঞ্চম শ্রেণির প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীদের পাঠদানে সমস্যা হচ্ছে। তাদের লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটছে।"

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোফাজ্জল হোসেন বলেন, "প্রধান শিক্ষক না থাকায় মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় প্রধান শিক্ষকের পদে পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। মামলা নিষ্পত্তি হলে পদোন্নতির মাধ্যমে এসব শূন্যপদ পূরণ করা যাবে।"