ভারতের কলকাতায় একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ফলে নিহত কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তসহ চারজনের মরদেহ কুষ্টিয়ায় পৌঁছেছে। রোববার (২৩ আগস্ট) রাত ১টার দিকে কুষ্টিয়া মহাশ্মশানে দেবাশীষ দত্ত ও তার দুই বছরের সন্তান স্বর্ণাশিষ দত্তের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়। একই রাতে দেবাশীষের স্ত্রী আফসানা শারমিন ও শ্বশুর আকরাম আলীকে রাত সাড়ে ৩টায় কুষ্টিয়া পৌর গোরস্থানে দাফন করা হয়।
এর আগে রাত সাড়ে ১০টার দিকে শহরের আড়ুয়াপাড়ায় দেবাশীষের বাসভবনে কফিনগুলো পৌঁছালে পরিবারে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের পরিবেশ। শেষবারের মতো প্রিয়জনের মুখ দেখতে সেখানে অপেক্ষায় ছিলেন স্বজন, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
দেবাশীষ দত্তের মরদেহ একনজর দেখতে তার বাসভবনে আসেন কুষ্টিয়া সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হারুন অর রশিদ, জেলা বিএনপির সদস্য সচিব জাকির হোসেন সরকারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। তারা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করেন।
দেবাশীষের মা স্বপ্না দত্ত ও বাবা দিলীপ দত্ত ছেলের নিথর দেহ সামনে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাদের আহাজারিতে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। বাবা, মা ও ভাইয়ের কফিনবন্দী দেহের দিকে অপলক তাকিয়ে ছিল দেবাশীষের ছোট মেয়ে মহিমা দত্ত। স্বজন হারানোর শোকে স্তব্ধ শিশুটির নির্বাক চোখে ফুটে ওঠে গভীর বেদনা।
অন্যদিকে শহরের থানাপাড়ায় দেবাশীষ দত্তের শ্বশুরবাড়িতেও চলছে শোকের মাতম। স্ত্রী আফসানা শারমিন ও তার বাবা আকরাম আলীর মরদেহ পৌঁছানোর পর সেখানেও স্বজনদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। আড়ুয়াপাড়া ও থানাপাড়ার দুই পরিবারেই এখন কেবলই শূন্যতা।
জানা যায়, শনিবার সকাল ৯টার দিকে একটি লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়ি ও একটি এসি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে বেনাপোল ইমিগ্রেশনের উদ্দেশে রওনা দেন দেবাশীষের স্বজন ও সাংবাদিক সহকর্মীরা। কলকাতা থেকে মরদেহ গ্রহণের দায়িত্বে থাকা ফিরোজ হোসেন মিঠু দুপুর ১টার দিকে লাশবাহী গাড়ি নিয়ে বেনাপোলের উদ্দেশে রওনা হন এবং বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে পৌঁছান। পরে বেনাপোল ইমিগ্রেশনের সকল প্রক্রিয়া শেষে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।
মরদেহ গ্রহণের সময় উপস্থিত ছিলেন কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও দৈনিক আজকের আলোর সম্পাদক গাজী মাহবুব, প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আল মামুন সাগর, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আনিসুজ্জামান ডাবলু এবং কুষ্টিয়া সাংবাদিক ইউনিয়নের (কেইউজে) সাংগঠনিক সম্পাদক নূরুন্নবী বাবুসহ সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ ও পরিবারের সদস্যরা।
অশ্রুসিক্ত নয়নে স্বজনেরা জানান, যে বাড়িতে একসময় ছিল হাসি-আনন্দ, সেখানে আজ কফিনের নীরবতা। প্রিয় মানুষের ফেরার অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের কাছে আজ আর কোনো ভাষা নেই, আছে কেবলই কান্না।
কুষ্টিয়া সাংবাদিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক নূরুন্নবী বাবু বলেন, "দেবার মরদেহ দেখার সাহস আমার হয়নি। সে শুধু সহকর্মী নয়, আমার ভাই ছিল। আমি কোনো কথা বলতে পারছি না।"
স্টার নিউজের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জহুরুল ইসলাম বলেন, "নিজের কোনো আত্মীয় মারা গেলেও হয়তো এত কষ্ট পেতাম না। দেবাশীষের সাথে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। মফস্বলের সাংবাদিকরা আমরা খুব অসহায়। দেবাশীষই ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, এখন পরিবারটির কী হবে?"
বিজয় টিভি ও টাইমস অব বাংলাদেশের প্রতিনিধি নাব্বির আল নাফিজ বলেন, "যে বাড়িতে স্বজনেরা হাসিমুখের অপেক্ষায় ছিলেন, সেখানে ফিরল নিথর দেহ। একজন মানুষ হিসেবে এই দৃশ্য মেনে নেওয়া কঠিন।"
কুষ্টিয়া সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক বাচ্চু বলেন, "এই মুহূর্তটি আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাবিধুর। একটি পরিবারের চারজন মানুষের একসাথে চলে যাওয়া পুরো কুষ্টিয়ার জন্যই অপূরণীয় ক্ষতি।"
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হারুন অর রশিদ জানান, নিহতদের পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১ লাখ টাকা সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।