তীব্র গ্যাস সংকটের মুখে দেশের শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসের চাপ শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসায় একপর্যায়ে ৩০০টির বেশি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ ছিল বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)। এই পরিস্থিতির ফলে রপ্তানি, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শনিবার (২২ আগস্ট) বিকেলে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় বিকেএমইএ ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, গত প্রায় এক মাস ধরে দেশে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানা তাদের নির্ধারিত সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না, যার ফলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সময়মতো রপ্তানি পণ্য সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, "উৎপাদন বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।"
তিনি আরও দাবি করেন, মাসে প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির বিপরীতে চলমান এই গ্যাস সংকটে প্রায় দেড় থেকে দুই বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংকটের পরোক্ষ প্রভাব আরও ভয়াবহ বলে উল্লেখ করে তিনি জানান, গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে বাংলাদেশের শিল্পখাত নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। ইতোমধ্যে কিছু ক্রেতা তাদের অর্ডার প্রতিবেশী দেশগুলোতে সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত অর্ডার বাতিল হয়ে অন্য দেশে চলে গেছে। আগামী মৌসুমের অর্ডারগুলোও সরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি জানান।
এই সংকট মোকাবিলায় বিকেএমইএ ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—জুন ও জুলাই মাসের গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল ১২ কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া, বিল পরিশোধে ব্যর্থ হলেও সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করা, গ্যাস পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত ব্রিফিং করা, গণপরিবহন ছাড়া অন্যান্য যানবাহনে সিএনজি সরবরাহ কমিয়ে শিল্পে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো, অবৈধ গ্যাস সংযোগ ও চুরি বন্ধ করা এবং গ্যাস সংকটের কারণে ঋণের কিস্তি দিতে ব্যর্থ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ঋণ শ্রেণীকরণ ছয় মাস স্থগিত রাখা।
বিকেএমইএ নেতারা মনে করেন, সাময়িক পদক্ষেপের পাশাপাশি শিল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই জ্বালানি পরিকল্পনা প্রয়োজন। দেশের গ্যাসের মজুত কমে আসায় ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভরতা বাড়বে। তাই তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের কাজ সেপ্টেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে আরও এফএসআরইউ ও স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের দাবি জানান তারা। এছাড়া শিল্পখাত দীর্ঘমেয়াদে গ্যাসনির্ভর থাকবে, নাকি এলপিজি, সৌরবিদ্যুৎ ও কয়লাভিত্তিক বয়লারের মতো বিকল্প জ্বালানিতে যাবে—সে বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকঋণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিকেএমইএ নেতারা। তাদের অভিযোগ, বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার থাকলেও অধিকাংশ ব্যাংক তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করছে না। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরও কঠোর পদক্ষেপ দাবি করা হয়।
অনুষ্ঠানে বিকেএমইএর নির্বাহী প্রেসিডেন্ট ফজলে এহসান শামীম, ভাইস প্রেসিডেন্ট (অর্থ) মোর্শেদ সারওয়ার সোহেল, সাবেক বিজিএমইএ সভাপতি কাজী মনীর, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অমল পোদ্দার, ভাইস প্রেসিডেন্ট আশিকুর রহমান, পরিচালক নজরুল ইসলাম স্বপন ও পরিচালক মামুনুর রশীদসহ সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।