সিমেন্টের ব্লক দিয়ে সারি সারি লাকড়ির চুলা বানানো হয়েছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) আবাসিক হলগুলোতে। কোনো চুলায় ভাত ফুটছে, আর অন্যটিতে চলছে তরকারি রান্না। ধোঁয়ায় ভরে থাকছে পুরো ঘর। বৃষ্টি হলে রান্নার কার্যক্রম আরও বেশি ব্যাহত হয়—ফলে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় অন্তত এক সপ্তাহ ধরে রান্নার কাজে চুলা জ্বলছে না। বাধ্য হয়ে ডাইনিংয়ের কর্মীরা সিমেন্টের ব্লক দিয়ে অস্থায়ী চুলা তৈরি করে লাকড়ি দিয়ে রান্না করছেন। এই পদ্ধতিতে একদিকে সময় বেশি লাগছে, অন্যদিকে আগুনের তাপজনিত কারণে কর্মীদের ভোগান্তিও বাড়ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য মোট আবাসিক হল রয়েছে ৯টি। এর মধ্যে ছয়টি ছাত্রদের আর তিনটি ছাত্রীদের। প্রতিটি হলে দিনে গড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ শিক্ষার্থীর জন্য রান্না হয়। আগে শিক্ষার্থীদের পছন্দমতো বিভিন্ন পদের খাবার রান্না করা হতো। তবে বর্তমানে তা হচ্ছে না—গ্যাসের সংকটে সীমিত পদের খাবারই প্রস্তুত হচ্ছে।
আবাসিক হলে কী রান্না হবে—এর তদারকির দায়িত্বে থাকেন শিক্ষার্থীরাই। প্রতি হলেই ডাইনিং ব্যবস্থাপনার জন্য তাঁদের একজন প্রতিনিধি রয়েছেন। শহীদ মোহাম্মদ শাহ হলের ডাইনিং ব্যবস্থাপক শিক্ষার্থী তাহমিদ সুপ্ত বলেন, ‘গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় প্রতিদিনের রান্নার পরিকল্পনা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়ে কয়েক শ শিক্ষার্থীর খাবার প্রস্তুত করতে হয়। কিন্তু লাকড়ির চুলায় রান্না করায় সময় ও শ্রম দুটোই বেশি লাগছে। পছন্দমতো খাবারের পদও রাখা যাচ্ছে না।’
ছাত্রীদের তাপসী রাবেয়া হলের ডাইনিং ব্যবস্থাপক শিক্ষার্থী সুনেহরা সুবাহ বলেন, ‘প্রচণ্ড গরম, ধোঁয়া ও হঠাৎ বৃষ্টির মধ্যে ডাইনিংয়ের নারী কর্মীদের কাজ করতে হচ্ছে। বৃষ্টিতে লাকড়ি ভিজে গেলে রান্না করতে আরও বেশি সময় লাগে। এ কারণে নির্ধারিত সময়ে খাবার পরিবেশন করা সম্ভব হয় না। এ কারণে অনেক শিক্ষার্থী না খেয়েই পরীক্ষা অথবা ক্লাসে যেতে বাধ্য হন। গ্যাসের সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’
পুরকৌশল বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নুসরাত খানম বলেন, ‘রান্নার সময় হলের আশপাশে গরম ও ধোঁয়াযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়। এ অবস্থায় রুমে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। স্বল্প সময়ের জন্য মানিয়ে নিলেও দীর্ঘ মেয়াদে কম কষ্টকর ও কার্যকর কোনো রান্নার ব্যবস্থা করা হলে শিক্ষার্থীদের জন্য সুবিধা হবে।’
গ্যাস সংকটে শুধু রান্না নয়, ডাইনিংয়ের বাবুর্চি ও কর্মচারীরাও ভোগান্তিতে পড়েছেন। শহীদ আবু সাঈদ হলের বাবুর্চি মো. আলমগীর বলেন, ‘লাকড়ি দিয়ে এত মানুষের রান্না এক-দুই দিন করা যায়, প্রতিদিন করা সম্ভব নয়। এতে কয়েক গুণ বেশি কষ্ট হচ্ছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যানটিনগুলোতেও প্রভাব পড়েছে। শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূর থেকে অনেক অনাবাসিক শিক্ষার্থী প্রতিদিন ক্লাস করতে ক্যাম্পাসে আসেন। তাঁদের খাবারের অন্যতম ভরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়া ও হলের ক্যানটিন। তবে গ্যাসের অভাবে সেখানেও রান্না ব্যাহত হচ্ছে। শহীদ মোহাম্মদ শাহ হলের ক্যানটিনের ইজারাদার সজীব বলেন, গ্যাস না থাকায় বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার কিনে রান্না করতে হচ্ছে। এতে খরচ কয়েক গুণ বেড়েছে।
আবাসিক হল ও ক্যানটিনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আবাসিক এলাকাতেও গ্যাস সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে। সেখানেও স্বাভাবিকভাবে গ্যাসের সুবিধা পাচ্ছেন না আবাসিক শিক্ষকেরা। রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মোসাম্মাত রোকসানা খাতুন বলেন, ‘সারা দিনই গ্যাস থাকে না। বাধ্য হয়ে ইলেকট্রিকের চুলায় রান্না করতে হচ্ছে। এ অবস্থা কত দিন চলবে, ঠিক নেই। সমস্যাটি দ্রুত সমাধান হওয়া প্রয়োজন।’
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী ও পুরকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তারেকুল আলম প্রথমা আলোকে বলেন, ‘মাতারবাড়ি থেকে গ্যাস সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে। এ কারণে সারা দেশেই গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। ওই সমস্যার সমাধান হলে চুয়েটেও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’