ডিম প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় থাকা পরিচিত একটি খাবার। সেদ্ধ, ভাজি, পোচ কিংবা বিভিন্ন রান্নায় ডিমের ব্যবহার রয়েছে। পুষ্টির দিক থেকেও ডিম গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে ভালো মানের প্রোটিনসহ নানা পুষ্টি উপাদান থাকে। তবে ডিম ঠিকমতো সংরক্ষণ না করলে বা অনেক দিন পড়ে থাকলে এর মান নষ্ট হতে পারে। এমন ডিম খেলে দেখা দিতে পারে খাদ্যে বিষক্রিয়ার মতো সমস্যা।
সমস্যা হলো, শুধু খোসা দেখে সব সময় বোঝা যায় না ডিমটি ভালো আছে কি না। তাই ডিম কেনা, সংরক্ষণ ও রান্নার সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি।
পচা ডিম খেলে কী হতে পারে?
নষ্ট বা দূষিত ডিমে ক্ষতিকর জীবাণু থাকতে পারে। এর মধ্যে সালমোনেলার মতো ব্যাকটেরিয়াও থাকতে পারে, যা খাদ্যে বিষক্রিয়ার কারণ হতে পারে।
এ ধরনের ডিম খাওয়ার পর বমি, ডায়রিয়া, পেটে ব্যথা বা মোচড়, বমি বমি ভাব এবং জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। কারও ক্ষেত্রে উপসর্গ তুলনামূলক হালকা হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে অসুস্থতা গুরুতরও হতে পারে।
ডায়রিয়া ও বমি হলে শরীর থেকে পানি ও লবণ বেরিয়ে যেতে পারে। ফলে পানিশূন্যতার ঝুঁকিও তৈরি হয়। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে খাদ্যে বিষক্রিয়া বেশি গুরুতর হতে পারে।
পচা ডিমের গন্ধ কেমন?
ডিম ফাটানোর পর যদি তীব্র দুর্গন্ধ পাওয়া যায়, তাহলে সেটি খাওয়া উচিত নয়। পচা ডিমে সাধারণত অস্বাভাবিক বা পচা গন্ধ থাকে। ডিমের সাদা অংশ বা কুসুমের রং ও গঠনেও অস্বাভাবিকতা দেখা যেতে পারে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। সালমোনেলার মতো কিছু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থাকলেও ডিমে সব সময় দুর্গন্ধ বা চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন নাও থাকতে পারে। অর্থাৎ শুধু গন্ধ বা চেহারা দেখে ডিম পুরোপুরি নিরাপদ কি না নিশ্চিত হওয়া যায় না। এজন্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও ভালোভাবে রান্না করা গুরুত্বপূর্ণ।
পানিতে ডিম ভাসলে কি পচা?
ডিম ভালো না খারাপ বোঝার জন্য পানিতে ডুবিয়ে দেখার একটি প্রচলিত পদ্ধতি রয়েছে। টাটকা ডিম সাধারণত পানিতে ডুবে থাকে। সময়ের সঙ্গে ডিমের খোসা দিয়ে ভেতরের আর্দ্রতা ও গ্যাস বেরিয়ে যাওয়ায় ডিমের ভেতরের বায়ুথলি বড় হয়। ফলে পুরোনো ডিম পানিতে কাত হয়ে থাকতে পারে বা ভেসে উঠতে পারে।
তবে পানিতে ভাসা মানেই ডিম পচে গেছে, এমন নয়। এটি মূলত ডিমটি কতটা পুরোনো হয়েছে তার একটি ধারণা দিতে পারে। পানিতে ভাসা ডিম ব্যবহার করতে হলে সেটি আলাদা পাত্রে ফাটিয়ে গন্ধ, রং ও চেহারা পরীক্ষা করা ভালো। অস্বাভাবিক কিছু মনে হলে ফেলে দিন।
খোসা দেখে কীভাবে বুঝবেন?
ডিম কেনার সময় প্রথমেই খোসা পরীক্ষা করুন। খোসায় ফাটল আছে কি না দেখুন। ফাটা খোসা দিয়ে ব্যাকটেরিয়া ডিমের ভেতরে ঢুকে যেতে পারে। তাই ফাটা ডিম না কেনাই নিরাপদ।
খোসা যদি অতিরিক্ত পিচ্ছিল হয়, ছত্রাকের মতো কিছু দেখা যায় বা অস্বাভাবিক দাগ থাকে, সেই ডিমও ব্যবহার না করাই ভালো। তবে খোসার রং আলাদা হলেই ডিম নষ্ট, এমনটা নয়। ডিমের খোসার রং মূলত মুরগির জাতসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।
ডিম ফাটানোর পর কী দেখবেন?
ডিম ফাটানোর পর কয়েকটি বিষয় খেয়াল করা যায়।
প্রথমত, গন্ধ। তীব্র দুর্গন্ধ থাকলে ডিমটি ফেলে দিন।
দ্বিতীয়ত, সাদা অংশ ও কুসুমের চেহারা। অস্বাভাবিক রং, পচা বা অস্বাভাবিক গন্ধ থাকলে সেটি ব্যবহার করবেন না। গোলাপি বা ইরিডিসেন্ট ধরনের সাদা অংশ নষ্ট হওয়ার লক্ষণ হতে পারে।
তবে কুসুমে ছোট লালচে বা বাদামি দাগ থাকলেই ডিম পচা, এমন নয়। এ ধরনের রক্তের দাগ ডিম তৈরির সময় ছোট রক্তনালি ফেটে যাওয়ার কারণে হতে পারে এবং এটি নিজে থেকে ডিম অনিরাপদ হওয়ার প্রমাণ নয়।
ডিম কীভাবে সংরক্ষণ করবেন?
ডিম কেনার পর দ্রুত বাড়িতে এনে ফ্রিজে রাখা ভালো। খাদ্যনিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের পরামর্শ অনুযায়ী ডিম ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা উচিত। ডিম মূল প্যাকেটেই রাখা ভালো এবং ফ্রিজের দরজার বদলে ভেতরের তুলনামূলক ঠান্ডা অংশে রাখা যায়।
প্যাকেটজাত ডিম হলে প্যাকেটের তারিখ ও সংরক্ষণের নির্দেশনাও দেখে নেওয়া উচিত।
রান্না করা ডিমও দীর্ঘ সময় বাইরে রেখে দেওয়া ঠিক নয়। শক্ত করে সেদ্ধ করা ডিম রান্নার পর দুই ঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজে রাখা উচিত এবং সাধারণত এক সপ্তাহের মধ্যে খেয়ে ফেলা ভালো।
ডিম ভালোভাবে রান্না করুন
ডিমে থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার ঝুঁকি কমাতে ডিম ভালোভাবে রান্না করা গুরুত্বপূর্ণ। ডিমের সাদা অংশ ও কুসুম জমাট হওয়া পর্যন্ত রান্না করা নিরাপদ পদ্ধতিগুলোর একটি। আধা সেদ্ধ বা কাঁচা ডিম খাওয়ার ক্ষেত্রে খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।
কাঁচা ডিম ব্যবহারের আগে ও পরে হাত, বাসন এবং রান্নার জায়গা ভালোভাবে পরিষ্কার করাও জরুরি।
ভুল করে পচা ডিম খেয়ে ফেললে কী করবেন?
ভুল করে নষ্ট বা দূষিত ডিম খেয়ে ফেললে সঙ্গে সঙ্গে অসুস্থতা নাও দেখা দিতে পারে। খাদ্যে বিষক্রিয়ার উপসর্গ জীবাণুর ধরন অনুযায়ী কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পরও শুরু হতে পারে। সাধারণ লক্ষণের মধ্যে ডায়রিয়া, পেট ব্যথা বা মোচড়, বমি বমি ভাব, বমি ও জ্বর রয়েছে।
বমি বা ডায়রিয়া হলে পর্যাপ্ত তরল পান করে পানিশূন্যতা এড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। তবে ডায়রিয়া তিন দিনের বেশি স্থায়ী হলে, পায়খানায় রক্ত দেখা দিলে, খুব বেশি জ্বর হলে, বারবার বমি হলে বা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
সবচেয়ে সহজ নিয়ম হলো, ডিম নিয়ে সন্দেহ হলে ঝুঁকি না নেওয়া। শুধু পানিতে ডুবে গেল বা ভেসে উঠল, এমন একটি পরীক্ষার ওপর নির্ভর না করে ডিমের সংরক্ষণ, খোসার অবস্থা, ফাটানোর পর গন্ধ ও চেহারা এবং রান্নার পদ্ধতি সবকিছু বিবেচনা করুন। সন্দেহ থাকলে ডিমটি না খাওয়াই নিরাপদ।
সূত্র: টিভি ৯