গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির টান এখন জ্বালানি তেলের ওপর চাপ তৈরি করছে। গ্যাস না পেয়ে উৎপাদন চালু রাখতে ইস্পাতসহ নানা খাতের প্রতিষ্ঠান ডিজেল ও ফার্নেস তেলের ব্যবহার বাড়িয়েছে। এতে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যাহত হলেও স্বল্পমাত্রায় কার্যক্রম টিকিয়ে রাখতে তেলনির্ভরতা বাড়ছে।
গ্যাসের সংকটের পাশাপাশি বিদ্যুতের ঘাটতি সামাল দিতে ফার্নেসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রেও জ্বালানি হিসেবে তেলের ব্যবহার বেড়েছে। সরকারি তিন তেল বিপণন কোম্পানি—পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েলের আগস্টের প্রথম ১৫ দিনের বিক্রির হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিদ্যুৎকেন্দ্র—দুই ক্ষেত্রেই ডিজেল ও ফার্নেস তেলের চাহিদা বেড়েছে।
গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি আগস্টের প্রথম ১৫ দিনে পদ্মা অয়েলের মোট ডিজেল বিক্রি প্রায় ২৯ শতাংশ ও ফার্নেস ১৭৪ শতাংশ বেড়েছে। মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ডিজেল বিক্রি বেড়েছে প্রায় ২১ শতাংশ ও ফার্নেস ১৫২ শতাংশ। যমুনা অয়েলের শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ডিজেল বিক্রি বেড়েছে ৩৩ শতাংশ এবং শিল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফার্নেস বিক্রি বেড়েছে ২২৪ শতাংশ।
পদ্মা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, গ্যাস-সংকটের কারণে শিল্পকারখানা থেকে জ্বালানি তেলের চাহিদা বেড়েছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ ঢাকার আশপাশের শিল্পাঞ্চলে চাপ বেশি। তবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছে।
দেশের শিল্পকারখানায় গ্যাসের সংকট আগে থেকেই ছিল। গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালে অগ্নিদুর্ঘটনার পর সংকট তীব্র হয়। ওই দুটি টার্মিনাল থেকে স্বাভাবিক সময়ে দিনে প্রায় ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়। দুর্ঘটনার পর প্রায় ২৫ দিন সরবরাহে বড় ঘাটতি ছিল। ১৫ আগস্ট সামিটের টার্মিনাল পুরোদমে এবং এক্সিলারেটের টার্মিনাল আংশিক চালু হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়।
তবে নতুন এলএনজি কার্গো না থাকায় স্বস্তি টেকেনি। এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে সরবরাহ ক্রমে কমে গত বুধবার বেলা তিনটার দিকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এতে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ আবার কমে দৈনিক প্রায় ২২২ কোটি ঘনফুটে নেমেছে; দেশে চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এই ঘাটতিতে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন ধরে রাখতে ডিজেল ও ফার্নেস তেলের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, আগামীকাল রোববার নতুন এলএনজি কার্গো এলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
তেল কোম্পানিগুলোর তথ্য অনুযায়ী, শিল্পকারখানায় ডিজেল মূলত জেনারেটর চালিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়; কিছু ক্ষেত্রে বয়লারেও ডিজেল ব্যবহার করা হয়। ফার্নেস তেল শিল্পকারখানার বয়লার ও চুল্লিতে তাপ তৈরির কাজে লাগে এবং ফার্নেস তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রেও এটি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি বাড়লে তেলের চাহিদাও বাড়ে।
পদ্মা অয়েলের হিসাবে চলতি আগস্টের প্রথম ১৫ দিনে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ৪ হাজার ৮৯২ টন। গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩ হাজার ৭৮১ টন। অর্থাৎ শিল্পে ডিজেল বিক্রি বেড়েছে প্রায় ২৯ শতাংশ। একই সময়ে ফার্নেস তেলের বৃদ্ধির হার আরও বেশি—শিল্পে পদ্মার বিক্রি ১৮৯ টন থেকে বেড়ে ১ হাজার ৮০৯ টন হয়েছে—বৃদ্ধি প্রায় ৮৫৭ শতাংশ। তবে পরিমাণের হিসাবে বড় অংশই বিদ্যুৎকেন্দ্রে গেছে। সেখানে বিক্রি ৭ হাজার ৯১১ টন থেকে বেড়ে ২০ হাজার ৩৫০ টন হয়েছে। সব মিলিয়ে পদ্মার ফার্নেস বিক্রি বেড়েছে প্রায় ১৭৪ শতাংশ।
বড় শিল্প গ্রাহকদের বিক্রির হিসাব পর্যালোচনায়ও চাপের বিষয়টি স্পষ্ট। ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যাল গত বছরের ১ থেকে ১৫ আগস্ট পদ্মা থেকে ২৬৫ দশমিক ৬০ টন ডিজেল নিয়েছিল; চলতি বছরের একই সময়ে নিয়েছে ৪৪৩ দশমিক ৯৩ টন। অর্থাৎ ডিজেল নেওয়া বেড়েছে প্রায় ৬৭ শতাংশ। বেঙ্গল গ্লাস গত বছরের প্রথম ১৫ দিনে ২২ দশমিক ৭৭ টন ডিজেল নিয়েছিল; এবার একই সময়ে ৫৩ দশমিক ১২ টন নিয়েছে—বৃদ্ধির হার প্রায় ১৩৩ শতাংশ। আল-মুসলিম গ্রুপের একেএম নিটওয়্যার গত বছরের একই সময়ে ৩৭ দশমিক ৯৪ টন ডিজেল নিয়েছিল; এবার নিয়েছে ১১৩ দশমিক ৮৩ টন—ডিজেল নেওয়া বেড়েছে ২০০ শতাংশ। একমি ল্যাবরেটরিজ গত বছরের প্রথম ১৫ আগস্ট নিয়েছিল ৬৮ দশমিক ৩০ টন ডিজেল; এবার নিয়েছে ২৭৬ দশমিক ৯৮ টন—বৃদ্ধি প্রায় ৩০৬ শতাংশ।
যমুনা গ্রুপ গত বছরের একই সময়ে ১৫ দশমিক ১৮ টন ডিজেল নিয়েছিল; এবার নিয়েছে ৬৮ দশমিক ৩০ টন, বৃদ্ধির হার ৩৫০ শতাংশ। এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যাল গত বছরের প্রথম ১৫ দিনে নিয়েছিল মাত্র ৭ দশমিক ৫৯ টন ডিজেল; এবার একই সময়ে নিয়েছে ৬০ দশমিক ৭১ টন—বৃদ্ধি ৭০০ শতাংশ। ফার ইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইং ইন্ডাস্ট্রিজ গত বছরের একই সময়ে পদ্মা থেকে কোনো ডিজেল নেয়নি; এবার নিয়েছে ৮৩ দশমিক ৪৭ টন। একইভাবে ক্রাউন ওয়্যারস (প্রাইভেট) লিমিটেড গত বছরের ওই সময়ে কোনো ডিজেল না নিলেও এবার নিয়েছে ৭৫ দশমিক ৮৯ টন।
তেল কোম্পানির তিন কর্মকর্তা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ছোট–বড় মিলিয়ে তিন কোম্পানি থেকে ৫ শতাধিক শিল্পকারখানা নিয়মিত তেল কেনে। গত বছরের তুলনায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কারখানা বাড়তি ডিজেল ও ফার্নেস তেল নিচ্ছে।
মেঘনা পেট্রোলিয়ামের হিসাবেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। কোম্পানিটির শিল্প গ্রাহকদের কাছে ডিজেল বিক্রি ৭ হাজার ১২২ টন থেকে বেড়ে ১১ হাজার ৭২২ টন হয়েছে—বৃদ্ধি প্রায় ৬৫ শতাংশ। একই সময়ে কোম্পানিটির মোট ডিজেল বিক্রি বেড়েছে প্রায় ২১ শতাংশ। শিল্প গ্রাহকদের কাছে ফার্নেস বিক্রি ২৩৬ টন থেকে বেড়ে ৬২৩ টন হয়েছে। তবে বড় চাপটি এসেছে বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে—সেখানে ফার্নেস বিক্রি ৭ হাজার ৬৩৭ টন থেকে বেড়ে ১৯ হাজার ২৩৬ টনে উঠেছে। ফলে কোম্পানিটির মোট ফার্নেস বিক্রি বেড়েছে প্রায় ১৫২ শতাংশ।
মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহীরুল হাসান বলেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে বাড়তি চাহিদা এলেও সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। ঢাকা অঞ্চলে এই বাড়তি চাহিদা তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে তেলের চাহিদা বেড়েছে।
যমুনা অয়েলের ক্ষেত্রে শিল্প গ্রাহকদের কাছে ডিজেল বিক্রি ৪ হাজার ৯২৮ টন থেকে বেড়ে ৬ হাজার ৫৬৪ টন হয়েছে। আর শিল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্র মিলিয়ে ফার্নেস বিক্রি ৩ হাজার ৯৮৯ টন থেকে বেড়ে ১২ হাজার ৯২৮ টনে উঠেছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। চলতি আগস্টের প্রথম ১৫ দিনে দেশে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৫৩৮ টন; দৈনিক গড় প্রায় ১১ হাজার ৯৬৯ টন। গত বছরের পুরো আগস্টের দৈনিক গড়ের তুলনায় এটি প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ফার্নেস বিক্রি হয়েছে ৬৬ হাজার ৬৮৮ টন; দৈনিক গড় প্রায় ৪ হাজার ৪৪৬ টন, যা গত বছরের পুরো আগস্টের দৈনিক গড়ের তুলনায় প্রায় ৭৬ শতাংশ বেশি।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. মনজুর আলম বলেন, জ্বালানি তেলের বাড়তি চাহিদা এলেও মজুতের সংকট নেই। আমদানিপ্রক্রিয়া স্বাভাবিক আছে এবং নিয়মিত তেলবাহী জাহাজ আসছে। বিপিসির ১৫ আগস্টের হিসাবে দেশে সরবরাহযোগ্য ডিজেলের মজুত ছিল ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৮৮২ টন এবং ফার্নেস ৫১ হাজার ৩৪৮ টন।
বাড়তি তেল ব্যবহার করে উৎপাদন ধরে রাখলেও খরচ বাড়ছে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর। বিএসআরএমের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত মুক্তকণ্ঠকে বলেন, গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পর ডিজেল ও ফার্নেস তেল ব্যবহার করতে হচ্ছে। তাঁদের তেলের ব্যবহার ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এতে উৎপাদন খরচ অন্তত চার গুণ হয়েছে।
ওষুধশিল্পেও চাপ কমছে না। বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সাবেক মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাকির হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতে তাঁদের প্রতি ইউনিটে প্রায় ১৫ টাকা খরচ হয়। ডিজেল জেনারেটরে একই বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ে ৪১ থেকে ৪২ টাকা। তাঁর হিসাবে সামগ্রিক জ্বালানি খরচ ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে জেনারেটরের রক্ষণাবেক্ষণ ও উৎপাদন কমে যাওয়ার ক্ষতি। দীর্ঘ সময় জেনারেটর চালানোর কারণে সার্ভিসিংও ঘন ঘন করতে হচ্ছে। আবার ওষুধের মতো সংবেদনশীল উৎপাদনে বিদ্যুৎ–বিভ্রাট হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরো ব্যাচ বাতিল করতে হয়।