কোয়ান্টাম বলবিদ্যার নানা “অসম্ভব” বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করে আসছেন বিজ্ঞানীরা। এবার দীর্ঘদিনের ধারণা ও সংশয় কাটিয়ে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব অটোয়া এবং জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর দ্য সায়েন্স অব লাইটের বিজ্ঞানীরা সরাসরি সূর্যের আলো ব্যবহার করে জোড়া ফোটন বা এন্ট্যাঙ্গলড ফোটন তৈরির কথা বলেছেন। অপটিকা সাময়িকীতে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এন্ট্যাঙ্গলমেন্ট এমন একটি ভৌত ঘটনা, যেখানে দুটি কণা পরস্পর এমনভাবে যুক্ত থাকে যে একটির অবস্থান বদলানো বা পরিমাপের প্রভাব অন্যটির ওপর সরাসরি পড়ে। প্রচলিতভাবে শক্তিশালী লেজার রশ্মি বিশেষ ক্রিস্টালে প্রয়োগ করে ফোটন দিয়ে এন্ট্যাঙ্গলড অবস্থা তৈরি করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রচুর শক্তি এবং উচ্চপ্রযুক্তির লেজার রশ্মির প্রয়োজন হয়—তবে নতুন পদ্ধতিতে সরাসরি সূর্যের আলো ব্যবহার করে এন্ট্যাঙ্গলড তৈরি করা সম্ভব বলে দাবি করা হচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, সূর্যের আলোর রং ও প্রবাহের দিক এলোমেলো হওয়ায় গবেষণাকালে আলোক তরঙ্গের ওঠানামার দিক বা পোলারাইজেশনের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়েই সূর্যের স্বাভাবিক বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে বিশুদ্ধ এন্ট্যাঙ্গলমেন্ট তৈরি করায় সাফল্য মিলেছে। গবেষণা উদ্ভাবনের সম্ভাব্য প্রয়োগ হিসেবে দুর্গম গবেষণা স্টেশন বা মহাকাশে থাকা স্যাটেলাইটে সস্তায় কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ দেখছেন বিজ্ঞানীরা।
ইউনিভার্সিটি অব অটোয়ার পদার্থবিজ্ঞানী চিয়াং লি জানান, ‘আমাদের গবেষণা প্রমাণ করে কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গলমেন্টের কাজে প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করা সম্ভব। আমাদের তত্ত্ব অনুসারে এন্ট্যাঙ্গলমেন্ট কেবল পোলারাইজেশনের ওপর নির্ভর করলে আলো প্রবাহের দিক বা রং কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। গবেষণাগারে তৈরি এই ফোটন কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। এগুলো নিখুঁত এন্ট্যাঙ্গলমেন্টের প্রায় ৯৪ শতাংশ কাছাকাছি ছিল। এ ছাড়া বিখ্যাত বেলের অসমতা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে।’
বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, একবার এন্ট্যাঙ্গলড ফোটন তৈরি হলে তাদের যত দূরেই রাখা হোক না কেন, তাদের অদৃশ্য বন্ধন অক্ষুণ্ন থাকে। ভবিষ্যতে মহাকাশে থাকা স্যাটেলাইটগুলো সূর্যের আলো ব্যবহার করে নিরাপদ এনক্রিপশন কি তৈরি করতে পারবে—এমন সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট উদ্যোগে আলাদাভাবে লেজার বা ভারী যন্ত্র বহনের প্রয়োজন হবে না বলেও বলা হয়েছে। কম্পিউটার সিস্টেমে অতিরিক্ত শক্তির খরচ না বাড়িয়ে প্রযুক্তি প্রসারে এই পদ্ধতি ভূমিকা রাখতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে ক্ষেত্রটির অনেক প্রখ্যাত বিজ্ঞানী সূর্যরশ্মি দিয়ে এই কাজ করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তবু বিজ্ঞানীরা নিজেদের গাণিতিক হিসাবের ওপর ভরসা রেখে সফলতার কথা জানিয়েছেন।