নোয়াখালীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। জেলার ৯টি উপজেলার ১ হাজার ২৫৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৭১০টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। অর্থাৎ প্রায় ৫৭ শতাংশ বিদ্যালয়েই কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত ১ হাজার ২৫৩টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত প্রধান শিক্ষক রয়েছেন ৫৪৩ জন। শূন্য থাকা পদগুলোর মধ্যে ৯৪১টি পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণযোগ্য। বর্তমানে ২২৩ জন শিক্ষক প্রধান শিক্ষক পদে চলতি দায়িত্ব পালন করছেন, যার ফলে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে এসব বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
উপজেলাভিত্তিক শূন্য পদের হিসাবে দেখা যায়, হাতিয়ায় ১৪৬টি, নোয়াখালী সদরে ৯২টি, বেগমগঞ্জে ৯২টি, চাটখিলে ৮৩টি, সোনাইমুড়ীতে ৬৯টি, সেনবাগে ৬৮টি, কবিরহাটে ৬৫টি, কোম্পানীগঞ্জে ৫৪টি এবং সুবর্ণচরে ৪১টি প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ, শিক্ষকদের সমন্বয়, পাঠদান তদারকি এবং সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো প্রধান শিক্ষকের। কিন্তু পদটি শূন্য থাকায় জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এতে দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি পাঠদানের চাপ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে শিক্ষকস্বল্পতা থাকা বিদ্যালয়গুলোতে এই সমস্যা প্রকট।
সেনবাগের ইটবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জেসমিন আক্তার বলেন, "প্রধান শিক্ষক না থাকায় তাকেই বিদ্যালয়ের সব কাজ করতে হয়। ক্লাসের ফাঁকে দাপ্তরিক কাজ করতে হয়। শিক্ষক মাত্র তিনজন হওয়ায় এতে সমস্যা হয়।"
সেনবাগের খাজুরিয়া সর্দারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সাখাওয়াত উল্যাহ জানান, তার বিদ্যালয়ে ২০১৩ সাল থেকে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। তিনি ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষক কম থাকায় দাপ্তরিক কাজে বাইরে গেলে পাঠদান চালিয়ে নিতে সমস্যা হয় বলে জানান তিনি।
সুবর্ণচর উপজেলার উত্তর চরজব্বার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ইখতিয়ার উদ্দিন ফারুক বলেন, "প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ সামলানোর পাশাপাশি নিয়মিত পাঠদানও করতে হচ্ছে। এতে একদিকে অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের পাঠদানেও কিছুটা ব্যাঘাত ঘটছে। দ্রুত একজন স্থায়ী প্রধান শিক্ষক পদায়ন করা হলে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম আরও ভালোভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।"
অভিভাবক ও জনপ্রতিনিধি মোহাম্মদ মমিন উল্লাহ বলেন, "প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ের সার্বিক কাজে কিছুটা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে শ্রেণিকক্ষের পড়াশোনায়। সন্তানরা নিয়মিত শিক্ষকদের তদারকি পাচ্ছে কি না, তা নিয়েও আমরা অভিভাবকেরা উদ্বিগ্ন।"
অন্য এক অভিভাবক সাইফুল ইসলাম জানান, প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে সহকারী শিক্ষকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, "আমাদের শিক্ষকেরা নিয়মিত ক্লাস নেন এবং বুঝিয়ে পড়ান। কিন্তু প্রধান শিক্ষক থাকলে স্কুলে আরও বেশি নিয়ম-শৃঙ্খলা থাকবে বলে মনে হয়। আমরা দ্রুত একজন প্রধান শিক্ষক চাই।"
পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী তাসনিম আক্তার বলেন, "আমাদের শিক্ষকেরা আমাদের যত্ন নিয়ে পড়ান। তবে প্রধান শিক্ষক না থাকায় অনেক সময় দাপ্তরিক কাজেও শিক্ষকদের ব্যস্ত থাকতে হয়। নতুন প্রধান শিক্ষক এলে শিক্ষকেরা ক্লাসে আমাদের আরও বেশি সময় দিতে পারবেন।"
সাবেক জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম জানান, এর আগে পদোন্নতির মাধ্যমে সংকট সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। দীর্ঘদিন নতুন নিয়োগ ও পদোন্নতি না হওয়ায় শূন্য পদের সংখ্যা বেড়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ইশরাত নাসিমা হাবিব জানান, জেলায় বর্তমানে ৭১০টি প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য 있으며 এর মধ্যে ২২৩টি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকেরা চলতি দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, "শূন্য পদ পূরণে ৯৪১টি পদোন্নতিযোগ্য পদের চাহিদাপত্র ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, "সরকার ইতিমধ্যে নিয়োগযোগ্য পদগুলো পূরণের বিষয়ে ঘোষণা দিয়েছে। আশা করছি, প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে প্রধান শিক্ষক সংকট অনেকটাই কমে আসবে এবং বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।"