পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার দক্ষিণ মুরাদিয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ১০২ বছর বয়সী আজাহার মোল্লা। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বিশ্রামে থাকার কথা থাকলেও বাস্তবতার চাপে তাকে এখনো শ্রম দিতে হচ্ছে। শারীরিক সক্ষমতা প্রায় শেষ হয়ে এলেও বেঁচে থাকার তাগিদে সপ্তাহে দুদিন স্থানীয় হাটে ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করেন তিনি।

শনিবার ও মঙ্গলবার কলবাড়ি হাট এবং শ্রীরামপুরের তালুকদার হাটে কাজ করেন আজাহার। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে বা ঝুঁকে কাজ করার ক্ষমতা না থাকায় কখনও বসে, কখনও শরীর নুইয়ে ঝাড়ু দেন তিনি। হাটের ব্যবসায়ীরা তাকে সামর্থ্য অনুযায়ী ৫ থেকে ১০ টাকা করে দেন, যা থেকে দিনশেষে তার আয় হয় প্রায় দেড় থেকে দুইশ টাকা। এই সামান্য আয়েই চলছে তার জীবন।

আজাহার মোল্লা বলেন, "অসুস্থ শরীর নিয়ে এখন আর পারছি না। তারপরও বেঁচে থাকার জন্য হাটে যাই। শনি আর মঙ্গলবার হাটে ঝাড়ু দিই। ব্যবসায়ীরা যে টাকা দেন, তা দিয়ে কোনোভাবে চলি।"

একসময় পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়নের ফ্যালাবুনিয়া গ্রামে তার পৈতৃক বাড়ি, জমিজমা ও সংসার ছিল। কিন্তু প্রায় ৫০ বছর আগে আগুনমুখা নদীর ভাঙনে সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যান তিনি। আজাহার বলেন, "আমার পৈতৃক বাড়ি রাঙ্গাবালী উপজেলার টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়নের ফ্যালাবুনিয়া গ্রামে ছিল। যৌবনে জমিজমা, ঘরবাড়ি সবকিছুই ছিল। বিয়ে-সাদিও করেছিলাম। কিন্তু কপালে আর সুখ সইল না। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আগুনমুখা নদীতে প্রায় ৫০ বছর আগে সবকিছু বিলীন হয়ে যায়।"

সব হারানোর পর স্ত্রী মারা যান এবং দীর্ঘ সময় ভবঘুরের জীবন কাটাতে হয় তাকে। প্রায় ৩০ বছর আগে মুরাদিয়ায় দ্বিতীয় বিয়ে করলেও সেই সংসারে কোনো সন্তান হয়নি। ১৫ বছর আগে দ্বিতীয় স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি পালক মেয়ে মরিয়ম বেগমের আশ্রয়ে আছেন। মরিয়ম পুরোনো কাপড় ফেরি করে তিন সন্তান নিয়ে সংসার চালান।

মরিয়ম বেগম বলেন, "আমি গরিব মানুষ। পুরোনো কাপড় ফেরি করে কোনোমতে তিন ছেলে-মেয়ে নিয়ে সংসার চালাতে হয়। এরপর বাবার ভরণপোষণ দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাবা সরকারি কোনো সাহায্য পান না।"

আজাহার জানান, একসময় তিনি বয়স্ক ভাতা পেতেন, যা বর্তমানে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সরকারি সহায়তা না থাকায় অন্যের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাকে। হাটের ব্যবসায়ীরা মনে করেন, এই বয়সে তার কাজ করার চেয়ে সরকারি ও সামাজিক সহায়তা পাওয়া বেশি প্রয়োজন।

বিষয়টি নিয়ে মুরাদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. হাফিজুর রহমান ফোরকান জামান বলেন, "আপনাদের মাধ্যমে আমি বিষয়টি জানতে পেরেছি। খোঁজখবর নিয়ে তার জন্য সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।"

স্থানীয়দের দাবি, আজাহার মোল্লার বন্ধ হয়ে যাওয়া বয়স্ক ভাতা পুনরায় চালু করা হোক এবং তাকে এককালীন সহায়তা প্রদান করা হোক, যাতে জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি স্বস্তিতে কাটাতে পারেন।