সিলেট নগরে স্বামী-স্ত্রী ও তাদের গৃহকর্মীকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার বাবুল মিয়ার জবানবন্দিতে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশের ভাষ্যমতে, প্রেমের সম্পর্কের কারণে নয়, বরং বাসা ভাড়ার টাকা জোগাড় করতে ওই বাসায় চুরি করতে গিয়েছিলেন বাবুল। সেখানে গৃহকর্মীর কাছে ধরা পড়ে যাওয়ার পর নিজের অপরাধ আড়াল করতে একে একে তিনজনকে হত্যা করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সন্ধ্যায় চার দিনের রিমান্ড শেষে বাবুল মিয়াকে সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা সুলতানার আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত জবানবন্দি রেকর্ড করার পর রাত সাড়ে নয়টার দিকে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
সিলেটের কোর্ট ইন্সপেক্টর সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, "হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার বাবুল মিয়ার চার দিনের রিমান্ড বৃহস্পতিবার শেষ হয়। আদালতে হাজির করা হলে তিনি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য দিয়েছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে সেসব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়।"
গত ১২ আগস্ট রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দোতলা থেকে আব্দুস সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২) ও গৃহকর্মী তাহমিনার (১৫) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত আব্দুস সাত্তার সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সাবেক পরিচালক ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ছিলেন। এ ঘটনায় নিহত দম্পতির সন্তানরা যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফিরে গত শুক্রবার রাতে সিলেট কোতোয়ালি থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। তাদের মেয়ে সেলিনা সুলতানা মামলাটি করেন। তবে এজাহারে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার বাবুল মিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়নি।
এজাহারে সেলিনা দীর্ঘদিনের জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে তার বাবা, মা ও গৃহকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে বলে সন্দেহের কথা উল্লেখ করেন। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আইনজীবী ও ইম্পালস বিল্ডার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলামের সম্পৃক্ততার সন্দেহও প্রকাশ করেন তিনি।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল জানিয়েছেন, বাসা ভাড়ার টাকা পরিশোধ নিয়ে তিনি চাপে ছিলেন এবং সেই টাকা জোগাড় করতেই ওই বাসায় চুরি করতে যান। সেখানে গৃহকর্মী তাহমিনার কাছে ধরা পড়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পুলিশ সূত্রের দাবি, নিজের অপরাধ আড়াল করতে বাবুল প্রথমে গৃহকর্মী তাহমিনাকে এবং পরে গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্তা এম আব্দুস সাত্তারকে হত্যা করেন। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতেও তিনি একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন বলে ওই সূত্র জানিয়েছে।
বাবুলের বক্তব্য অনুযায়ী, বাসায় ঢোকার পর তিনি গৃহকর্মী তাহমিনার মুখোমুখি হন। তাকে দেখে তাহমিনা চিৎকার করে পালানোর চেষ্টা করলে বাবুল তাকে ধরে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন। তাহমিনার চিৎকার শুনে গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম সেখানে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। এরপর গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তারকে হত্যা করেন বাবুল—এমনটাই তার জবানবন্দিতে উঠে এসেছে বলে পুলিশ সূত্রের দাবি।
পুলিশ জানিয়েছে, তিনজনকে হত্যার সময় বাবুলের নিজের হাত ও আঙুলেও আঘাত লাগে। হত্যার পর তিনি বাথরুমে গিয়ে শরীর, পোশাক ও ছুরিতে লেগে থাকা রক্ত পরিষ্কার করেন। এরপর বাসার আলমারি ও ওয়ারড্রোব তল্লাশি করে ১৫ হাজার টাকা নেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আরও কিছু নেওয়ার চেষ্টা করলেও দরজায় নক করার শব্দ শুনে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন বাবুল। পরে যে পথ দিয়ে বাসায় ঢুকেছিলেন, সেই পথেই বেলকনি ও সানশেড দিয়ে নেমে পালিয়ে যান। যাওয়ার পথে কোনো এক স্থানে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটি ফেলে দেন বলে জবানবন্দিতে জানিয়েছেন তিনি।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সকাল ৯টা ২৬ মিনিটের পর বাবুল রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসায় প্রবেশ করেন। তবে মূল গেট দিয়ে বের হওয়ার দৃশ্য পাওয়া যায়নি, কারণ ওই সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ক্যামেরাটি বন্ধ ছিল। তবে কাছের ৮৩ নম্বর বাসার সিসিটিভি ক্যামেরায় বাবুলকে ২০ থেকে ২৫ মিনিটের মধ্যে টিভি গেটের গলি দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। ওই ক্যামেরাটি আইপিএসের সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় ফুটেজ ধারণ সম্ভব হয়। ফুটেজে তাকে দ্রুত চলে যেতে এবং কয়েকবার নিজের হাতের দিকে তাকাতে দেখা যায়। হত্যার দিন সন্ধ্যায় গ্রেপ্তারের সময় তার হাত ও আঙুলে আঘাতের চিহ্ন এবং ব্যান্ডেজ ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
বাবুল গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল, গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং তাহমিনা তাকে গালাগাল করায় প্রতিশোধ নিতে তিনি ওই বাসায় গিয়েছিলেন। তাহমিনাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসায় গৃহকর্তা ও তার স্ত্রীকেও হত্যা করেন—তখন এমনটাই বলা হয়েছিল। তবে নতুন জবানবন্দিতে চুরির উদ্দেশ্যের কথা আসায় আগের বক্তব্যের সঙ্গে পার্থক্য তৈরি হয়েছে।