অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাশয়ের অভাব এবং জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত যানবাহনের আধিক্যের কারণে ঢাকা শহরে তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে, যা ‘হিট আইল্যান্ড’ পরিস্থিতি তৈরি করছে। এই জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় জলাশয় বৃদ্ধি, সবুজায়ন, ছাদবাগান, পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরী বলেন, “বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ণ এবং অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত যানবাহনের ব্যবহার রাজধানীতে উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য প্রধানত দায়ী। কারণ অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত যানবাহন থেকেই কার্বন ডাই অক্সাইডের ৫৬ শতাংশ নির্গত হয়।”

এই পরিস্থিতি সামাল দিতে জ্বালানি তেলের বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক, ব্যাটারি ও হাইব্রিড গাড়ির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। একই সঙ্গে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে প্রচলিত যানবাহনের ব্যবহার কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা জানান ড. আবু নাসের।

নির্মাণ খাতের বিষয়ে তিনি বলেন, “উচ্চ ভবন নির্মাণে প্রচলিত ফায়ার ব্রিকসের ব্যবহার কমিয়ে সলিড ব্লক, হলো ব্লক ও নন-ফায়ার ব্রিকসের ব্যবহার বাড়াতে হবে।” এছাড়া ভবনে প্রচলিত কাচের বদলে ডাবল গ্লেজড ইউনিট (ডিজিইউ) গ্লাস, স্যান্ডউইচ গ্লাস ও টেম্পার্ড গ্লাস ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, কারণ এসব কাচে তাপ বিকিরণ কম হয়। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি ভবনে প্রচলিত স্প্লিট ও উইন্ডো এসির পরিবর্তে ভ্যারিয়েবল রেফ্রিজারেন্ট ফ্লো (ভিআরএফ) ও চিলারভিত্তিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

রাজধানীর সবুজায়ন বাড়াতে সড়ক বিভাজক, ফুটপাত এবং খোলা জায়গায় ল্যান্ডস্কেপিং ও আরবরিকালচারের মাধ্যমে গাছ লাগানো হচ্ছে। নতুন সুউচ্চ ভবনে ছাদবাগান তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। ড. আবু নাসের আরও বলেন, “ঢাকার তাপমাত্রা কমাতে ছোট ছোট পুকুর, লেক ও জলাশয়ের সংখ্যা বাড়াতে হবে।”

গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সমন্বয়) সুমন চাকমা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত গণপূর্ত মেট্রোপলিটন জোনে ৫ লাখ ৬২ হাজার গাছ লাগানোর লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে আরবরিকালচার গণপূর্ত বিভাগে ৫ লাখ ৫২ হাজার এবং অন্যান্য জোনে ১০ হাজার গাছ লাগানোর লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। ১৬ আগস্ট পর্যন্ত আরবরিকালচার গণপূর্ত বিভাগে ২২ হাজার ৩৯২টি এবং এসবি নগর গণপূর্ত বিভাগের জোন-৩ এলাকায় ১৫০টি গাছ লাগানো হয়েছে। এছাড়া ঢাকা জোনে ১০ হাজার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৫ হাজার ৩৩৯টি গাছ লাগানো হয়েছে।

তিনি আরও জানান, প্রচলিত বিদ্যুতের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর কাজ চলছে। ঢাকা গণপূর্ত ই/এম বিভাগের উদ্যোগে সোলার প্যানেল স্থাপন করে ৪ হাজার ৬২২ দশমিক ৪৮ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে।

গণপূর্ত বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) আশ্রাফুল হক বলেন, “প্রচলিত বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেল, গ্যাস ও ক্রুড অয়েল ব্যবহারের ফলে কার্বন নিঃসরণ হয়। এ নিঃসরণ কমাতে সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে।”

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী জানান, ঢাকাকে বসবাস উপযোগী করতে সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এবং তা বাস্তবায়নে অধিদপ্তর নিরলস কাজ করছে। তিনি বলেন, “এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমরা অধিদপ্তরের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়ে নতুন ঢাকা গড়তে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো, বিশেষ করে এশিয়া অঞ্চলের সিঙ্গাপুর সিটি, দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ও জাপানের টোকিও’র মতো ঢাকাকে প্রকৃতি ও পরিবেশবান্ধব সবুজ সিটিতে পরিণত করার লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।”