নেত্রকোনা পৌর শহরে শিশুদের চিত্তবিনোদন ও খেলাধুলার জন্য কোনো শিশুপার্ক নেই। শিশুদের নিয়ে স্বস্তিতে ঘোরার মতো নির্দিষ্ট কোনো বিনোদনকেন্দ্র বা উন্মুক্ত জায়গাও নেই। ফলে শহরের ঘিঞ্জি পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুদের বড় একটি অংশ বিদ্যালয় ও বাসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।

তবে দীর্ঘদিন ধরে শহরে একটি শিশুপার্ক নির্মাণের দাবি থাকলেও স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘জেলা শহরে একটি শিশুপার্ক স্থাপনের জন্য জায়গা খোঁজা হচ্ছে। অচিরেই এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

.

স্থানীয় বাসিন্দা ও পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ১৮৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত নেত্রকোনা পৌরসভার আয়তন ২১ দশমিক ২ বর্গকিলোমিটার। নয়টি ওয়ার্ডে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার মানুষের বসবাস। পৌর এলাকায় ২৬টি সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ১৭টি কিন্ডারগার্টেন রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। এ ছাড়া বিভিন্ন মাদ্রাসায় রয়েছে আরও পাঁচ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী।

প্রবীণ সাংবাদিক শ্যামলেন্দু পাল বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন জেলার সার্বিক উন্নয়ন হলেও নেত্রকোনা নানা দিক দিয়ে পিছিয়ে রয়েছে। স্বাধীনতার এত বছর পরও একটি জেলা শহরে শিশুপার্ক না থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে দাবি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।’

.

শিশুদের নিয়ে কাজ করা কয়েকজন সংগঠক ও অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুদের খেলাধুলা ও বিনোদনের পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। শহরেও নেই কোনো শিশু-কিশোরবান্ধব পার্ক বা বিনোদনকেন্দ্র। ফলে অনেক শিশুই ঘরে বসে স্মার্টফোন, টেলিভিশন ও বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে সময় কাটাচ্ছে।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জনউদ্যোগের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহরে শিশুপার্ক নির্মাণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এমনকি প্রতিবছর পৌর বাজেটেও শিশুপার্ক নির্মাণের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। কিন্তু বাস্তবে কোনো পার্ক নির্মাণ হয়নি। একটি পার্ক থাকলে শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের সুস্থ বিনোদনের সুযোগ তৈরি হতো এবং তাদের বিপথগামী হওয়ার ঝুঁকিও কমত।’

শহরের কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পরিবার নিয়ে একটু স্বস্তিতে ঘোরার জন্যও শহরে তেমন কোনো জায়গা নেই। বাধ্য হয়ে অনেকেই শহর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে পূর্বধলা সড়কের বাইপাস এলাকায় বেড়াতে যান। কেউ কেউ বিভিন্ন জলাশয়ের পাড়ে গিয়ে সময় কাটান।

.

জেলা উদীচীর সভাপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান খান বলেন, ‘এত সুন্দর একটি জেলা শহরে শিশুদের চিত্তবিনোদনের সুযোগ করে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। একটি পার্ক থাকলে শিশুরা প্রকৃতির সান্নিধ্যে আনন্দে বেড়ে উঠতে পারত। এমনকি শিশুদের সাঁতার শেখার মতোও কোনো ব্যবস্থা নেই।’

শিশুদের নিয়ে কাজ করা স্থানীয় একটি উন্নয়ন সংগঠনের ইউনিসেফ প্রকল্পের কর্মকর্তা সঞ্জয় সরকার। শিশুদের বিনোদনের বিষয় নিয়ে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য চিত্তবিনোদন ও খেলাধুলার পর্যাপ্ত সুযোগ প্রয়োজন। কিন্তু নেত্রকোনা শহরে এ সুযোগ একেবারেই নেই। ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে একটু হাঁটার মতোও কোনো পার্ক নেই, নেই খেলার মাঠ। দরজাবদ্ধ ঘর আর পাখির খাঁচার মতো কিন্ডারগার্টেন স্কুলই এখন শিশুদের ঠিকানা।’

.
জেলা শহরে শিশুদের জন্য একটি পরিকল্পিত বিনোদনকেন্দ্র বা শিশুপার্ক থাকা জরুরি। শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে একটি শিশুপার্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মো. আনোয়ারুল হক, সংসদ সদস্য, নেত্রকোনা-২ (সদর-বারহাট্টা) আসন
.

নেত্রকোনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালের সাবেক শিশুবিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নজরুল ইসলাম ফকির। তিনি বলেন, ‘শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য উপযুক্ত বিনোদন ও আনন্দময় পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই নেত্রকোনা শহরে একটি শিশুপার্ক স্থাপন করা জরুরি।’

তবে শিশুপার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রশাসন ও পৌরসভা। নেত্রকোনা পৌরসভার প্রশাসক মুনমুন জাহান লিজা বলেন, ‘পৌর শহরে একটি শিশুপার্ক স্থাপনের জন্য অনুকূল পরিবেশ ও উপযুক্ত জায়গা পাওয়া গেলে তা করা সম্ভব।’

শিশুপার্ক নির্মাণের আশ্বাস দিয়ে নেত্রকোনা-২ (সদর-বারহাট্টা) আসনের সংসদ সদস্য চিকিৎসক মো. আনোয়ারুল হক বলেন, জেলা শহরে শিশুদের জন্য একটি পরিকল্পিত বিনোদনকেন্দ্র বা শিশুপার্ক থাকা জরুরি। শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে একটি শিশুপার্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা ও সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।