কাউনিয়ার ষাটোর্ধ্ব গোলজার হোসেন একসময় দিনমজুরি ও কৃষিশ্রমিকের কাজ করে সংসার চালাতেন। তবে বই-খাতা ছেড়ে শৈশবেই অন্যের বাড়িতে কাজ নেওয়ার অভিজ্ঞতা পেরিয়ে তিনি এখন মসলার চাষে অন্যদেরও পথ দেখাচ্ছেন।

পারিবারিক সংকট কাটিয়ে জীবিকার বিকল্প খুঁজতে গিয়ে গোলজার হোসেনের যাত্রা শুরু হয় মাত্র ১৪টি তেজপাতার চারা দিয়ে। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে কাউনিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়। উপজেলা কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, কাউনিয়া উপজেলায় তেজপাতাচাষির সংখ্যা এক হাজার ছড়িয়েছে। উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের ৮৮৩ হেক্টর জমিতে এখন তেজপাতার চাষ হচ্ছে।

কাউনিয়া উপজেলা সদর থেকে দক্ষিণ দিকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরের বাজেমজকুর গ্রামে গোলজার হোসেনের বাড়ি। ৩১ জুলাই গ্রামে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার ধারে, পুকুরপাড়ে, বাড়ির আঙিনায় ও জমির আলে সারি সারি তেজপাতার গাছ। একই জমিতে আদা, হলুদসহ নানা রকম সবজির চাষও চলছে।

গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রোগ থেকে কীভাবে তেজপাতার চারা ও গাছ রক্ষা করা যায়—এ বিষয়ে চাষিদের নিয়মিত পরামর্শ দেন গোলজার। বাজেমজকুর গ্রাম কাউনিয়া উপজেলার টেপামধুপুর ইউনিয়নের আওতাধীন। এই ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হানিফ আলী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, দিন যতই যাচ্ছে, এলাকায় তেজপাতের চাষ ততই বাড়ছে। বাজেমজকুর গ্রামের ৯৫ শতাংশ লোক তেজপাতা চাষের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন।

একই কথা বলেছেন টেপামধুপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান রাশেদুল ইসলামও। তিনি বলেন, গোলজার হোসেনকে দেখেই কিছু লোক তেজপাতাসহ মসলার চাষ শুরু করেন। তাঁর ইউনিয়নের বেশির ভাগ মানুষের জীবিকার উৎস এখন মসলা চাষ।

গোলজার হোসেন দুই বোন, চার ভাইয়ের মধ্যে সবার বড়। তাঁর জন্ম ১৯৬৩ সালে। আট বছর বয়সে তিনি বাবাকে হারান। চতুর্থ শ্রেণিতে ওঠার পর বাধ্য হয়ে অন্যের বাড়ির গরু–ছাগল লালন–পালনের কাজ নিতে হয় তাঁকে। এরপর কখনো তাঁর পরিচয় ছিল দিনমজুর, কখনো কৃষিশ্রমিক। ২২ বছর বয়সে মায়ের মৃত্যু তাঁর জীবনে বড় আঘাত হয়ে আসে। কী করবেন, তখন কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না। বিভিন্নজনের সঙ্গে পরামর্শ করেন, কেউ কেউ ব্যবসার কথা বলেন। একজন বলেছিলেন, ধান–সবজির চাষ তো কমবেশি গ্রামের সবাই করে, মসলার চাষ করে দেখতে পারেন। লাভ হলেও হতে পারে!

মানসিক অস্থিরতার ওই সময়ে পরিবারের চাপে পড়ে বিয়েও করেন গোলজার হোসেন। বিয়ের কয়েক মাস পর কী এক কাজে কাউনিয়া থেকে বগুড়ায় যান তিনি। ফেরার সময় ১৪টি তেজপাতার চারা কিনেছিলেন। কৌতূহলবশত বাড়ির উঠানেই সেসব চারা রোপণ করেন। এর দুই বছরের মাথায় তেজপাতা বিক্রি করে গোলজার আয় করেন পাঁচ হাজার টাকা। এই টাকা থেকে চার হাজার টাকা দিয়ে ৮০ শতক জমি ইজারা নিয়ে ১০০টি তেজপাতার চারা লাগান। গাছের ফাঁকে ফাঁকে লাগান আদা আর হলুদ। স্ত্রী, পুত্র-কন্যাও গোলজারের সঙ্গে কাজে হাত লাগান।

মান ভালো হওয়ায় দেশের বড় বড় কোম্পানিও কাউনিয়া থেকে তেজপাতা কিনে নিয়ে যায়। তেজপাতাকে ঘিরে এলাকায় ব্যবসার প্রসারও ঘটেছে।
সিরাজুল ইসলাম, তেজপাতা ব্যবসায়ী, কাউনিয়া, রংপুর

একপর্যায়ে চাষের জমির সঙ্গে গোলজারের আয়ও কিছুটা বাড়তে থাকে। অভাবের সংসারে একটু একটু করে সচ্ছলতাও আসে। দিনমজুর থেকে গোলজার হোসেন হয়ে ওঠেন সফল চাষি। এখন দুই একর জমিতে মসলার চাষ করছেন গোলজার। খরচ বাদে বছরে তাঁর আয় হচ্ছে চার লাখ টাকা। লাভের টাকায় জমি কিনে বাড়ি করেছেন। দামি কাঠের আসবাবপত্রে ঘর সাজিয়েছেন। আম, কাঁঠাল, সুপারিসহ বিভিন্ন গাছ লাগিয়েছেন সেই বাড়ির চারদিকে। মাছ চাষের জন্য পুকুর খনন করেছেন। দুটি গাভি ও ছয়টি ছাগল আছে। উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ানোর পর দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। তিনি ছেলে চাকরি করছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে।

গোলজার হোসেন বলেন, রোদ, ঝড়বৃষ্টি মাথায় নিয়ে দিনমজুরের কাজ করেছেন। এরপরও স্ত্রী–সন্তানদের জন্য তিন বেলা খাবার জোগাড় করতে পারতেন না। তেজপাতার চাষে তাঁর দিন বদলেছে। কথায়–কথায় আরও বললেন, গ্রামের অন্যদেরও তেজপাতা চাষের পরামর্শ দিয়ে স্বাবলম্বী করে তুলতে কাজ করছেন তিনি। এ জন্য গ্রামের মানুষ তাঁকে সম্মান করেন।

ধান ছাড়া আর কোনো ফসলের আবাদে কাউনিয়ার কৃষকদের আগ্রহ ছিল না। কিন্তু গোলজারকে দেখে অনেকে তেজপাতা চাষ শুরু করেন। এখন ছয়টি ইউনিয়নেই তেজপাতা চাষ ছড়িয়ে পড়েছে।

৬৩ বছর বয়সী গোলজার হোসেনকে এলাকার মানুষ ‘গুরু’ মানেন। তাঁর দিকনির্দেশনায় বহু কৃষক সাফল্যের মুখ দেখেছেন। বাজেমজকুরের পাশের গ্রাম টেপামধুপুরের কৃষক মোসলেম উদ্দিন ২০১০ সালে ৩৩ শতক জমিতে তেজপাতা চাষ শুরু করেন। দুই বছরের মাথায় সাফল্য পাওয়ায় নিয়মিত তেজপাতা আর আদা–হলুদ চাষ করছেন। ১৬ বছর ধরে এই মসলা বিক্রির টাকায় জমি কিনেছেন, টিনের বাড়ি করেছেন, মোটরসাইকেলও কিনেছেন।

পুকুরপাড়ে, রাস্তার ধারে, জমির আলে, বাড়ির উঠানে এই গাছ লাগানো যায়। এক একর জমিতে দেড় শ চারা রোপণ করা যায়। সেখান থেকে দুই বছরের মাথায় তেজপাতা সংগ্রহ করা হয়।

টেপামধুপুর ইউনিয়ন পরিষদের পেছনেই জোহরা খাতুনের বাড়ি। তাঁর স্বামী জিয়াউল হক অসুস্থ। আগে অন্যের তেজপাতাবাগানে কাজ করতেন জোহরা। বাড়ির সামনে ২১ শতক জমি ও আঙিনায় তেজপাতার বেশ কিছু চারা লাগিয়েছিলেন তিনি। এখন তেজপাতা বিক্রি ও গাভি পালনের আয় দিয়ে সংসার খরচ মেটাচ্ছেন। তেজপাতা বিক্রির টাকায় এ পর্যন্ত চার শতক জমি কিনেছেন।

৩১ জুলাই জোহরার বাড়িতে যান মুক্তকণ্ঠের এই প্রতিবেদক। তিনি বলেন, ‘তেজপাতায় কোনো লস নাই, তেমন খরচও নাই।’

টেপামধুপুর গ্রামের মোখলেছার রহমান, ছমছের আলী, লেবু মিয়া, আসাদুজ্জামান, আবদুল জব্বার, সদরা তালুক গ্রামের আবু বক্কর, আরাজী কানুয়া গ্রামের মোবারক হোসেনও তেজপাতা চাষ করে একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বললেন। তাঁদের হিসাবে, আগে এক একর জমির ধান বিক্রি করে বছরে লাভ হতো ৩০-৪০ হাজার টাকা। একই জমিতে তেজপাতা ও আদা–হলুদ চাষ করে আয় করেছেন প্রায় দুই লাখ টাকা। প্রতি একর জমিতে তেজপাতা চাষ করতে খরচ হয় ১২-১৪ হাজার টাকা।

কাউনিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তানিয়া আকতার জানান, লাভ বেশি হওয়ায় লোকজন ধানি জমিতেও তেজপাতার চাষ করছেন। তেজপাতার চাষ বাড়াতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তেজপাতার চারা রোপণ করা হয়। পুকুরপাড়ে, রাস্তার ধারে, জমির আলে, বাড়ির উঠানে এই গাছ লাগানো যায়। এক একর জমিতে দেড় শ চারা রোপণ করা যায়। সেখান থেকে দুই বছরের মাথায় তেজপাতা সংগ্রহ করা হয়।

কাউনিয়ার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রিয়াজুল হক বলেন, এক একর জমি থেকে বছরে কমপক্ষে দেড় লাখ টাকার তেজপাতা বিক্রি হয়। উৎপাদন খরচ একরপ্রতি ১২-১৪ হাজার টাকার বেশি নয়। একই জমিতে সাথি ফসল হিসেবে আদা, হলুদ, মুলা, পালংশাক, বরবটি, বাঁধাকপি, লালশাক চাষ করা যায়। যেখান থেকে আরও ৩০-৩৫ হাজার টাকা আয় হয়। একটি গাছ থেকে শত বছর পর্যন্ত পাতা সংগ্রহ করা যায়।

যত দিন যাচ্ছে, বাজারে কাউনিয়ার তেজপাতার চাহিদাও বাড়ছে। সারা বছরই তেজপাতা বিক্রি হয়। স্থানীয় বাজারে বর্তমান শুকনা তেজপাতা ১০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।

কাউনিয়া উপজেলার তেজপাতা ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম বলেন, মান ভালো হওয়ায় দেশের বড় বড় কোম্পানিও কাউনিয়া থেকে তেজপাতা কিনে নিয়ে যায়। তেজপাতাকে ঘিরে এলাকায় ব্যবসার প্রসারও ঘটেছে।