পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রে বিএনপি সরকার পুরোনো ধারার পথেই হাঁটল বলে পর্যবেক্ষকরা বলছেন। গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ যেভাবে রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দলীয় নেতাদের নিয়োগ দিয়েছিল—সেই একই ধরনের রীতি অনুসরণ করে বিএনপিও রাঙামাটি ও বান্দরবানে দলীয় নেতাদের চেয়ারম্যান পদে বসিয়েছে। তবে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সংস্থার চাকরি থেকে সম্প্রতি অব্যাহতি নেওয়া এক কর্মকর্তাকে।
বর্তমান পরিষদ ভেঙে আজ বৃহস্পতিবার অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ পুনর্গঠন করা হয়। পৃথক তিনটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তিন জেলা পরিষদ পুনর্গঠন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পুনর্গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ স্ব স্ব জেলা পরিষদ আইন এবং এর সংশোধনীগুলোর বিধান অনুযায়ী পরিষদের সব দায়িত্ব পালন করবে।’
মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোঙ্গল চন্দ্র পাল স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন-১৯৮৯ ও সংশোধিত আইন ১৯৯৭ এর ১৬ (ক) (৪) এবং সংশোধিত আইন-২০১৪ এর ৪(২) উপধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। তিন জেলা পরিষদে চেয়ারম্যানের পাশাপাশি ১৪ জন করে সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর নিয়োগ দেওয়া চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ বাতিল করে পূর্বের পরিষদ বাতিল করা হয়েছে।
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অন্তর্বর্তীকালীন চেয়ারম্যান হিসেবে জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদারকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান কাজল তালুকদারের ছোট ভাই। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর কাজল তালুকদারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
দীপন তালুকদার ছাড়াও সদস্য পদে নতুন করে দায়িত্ব পেয়েছেন ১৪ জন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ১২ জন বিএনপি ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী; আর বাকি দুজনের রাজনৈতিক পরিচয় জানা যায়নি। আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) আমলেও দলীয় নেতা-কর্মীদের জেলা পরিষদের দায়িত্ব দেওয়া হতো।
নবগঠিত অন্তর্বর্তীকালীন জেলা পরিষদের সদস্যরা হলেন রাঙামাটি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ, সাংগঠনিক সম্পাদক শাশ্বত চাকমা, সদস্য বিল্টু চাকমা, সুবিমল চাকমা, পাইচিং মং মারমা, জুরাছড়ি উপজেলা বিএনপির সভাপতি অনিল বরণ চাকমা, কাপ্তাই উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক উথোয়াইমং মারমা, রাজস্থলী উপজেলার ঘিলাছড়ি ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তিমথী খিয়াং, লংগদু উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. তোফাজ্জল হোসেন, রাঙামাটি জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ ফারুক, জেলা বিএনপির সদস্য নন্দিতা দাশ ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক চন্দ্রা চাকমা। এ ছাড়া সাজেক রিসোর্ট অ্যান্ড কটেজ মালিক সমিতির সভাপতি সুপর্ণ দেব বর্মণ জেলা পরিষদের সদস্যর পদ পেয়েছেন। তাঁর দলীয় পরিচয় জানা যায়নি। দলীয় পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া আরেক সদস্য হলেন প্রেমা তালুকদার।
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আনন্দ তিষ্য চাকমা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে পরিষদের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির উপজাতিবিষয়ক সম্পাদক মাম্যাচিংকে। তিনি চারদলীয় জোট সরকারের সময়েও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন।
নতুন পরিষদের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন চনুমং, মংক্যনু মারমা, লুসাই মং, মাওসেতুং তংচংগ্যা, দনওয়াই লো, আগস্টিন ত্রিপুরা, অংজাই উই চাক, রিয়াল দাও বম, আবদুল মাবুদ, মশিউর রহমান, মোহাম্মদ জসিম উদ্দীন, ক্যউ প্রু খিয়াং, উম্যাসিং মার্মা ও কাজী নিরুতাঞ্জ বেগম।
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে ম্রাসাথোয়াই মারমাকে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। তিনি খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের সাবেক হিসাবরক্ষক। চলতি বছরের মার্চে চাকরি থেকে অবসর নেন। চাকরিজীবনের পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ মারমা ঐক্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা এবং স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
নতুন চেয়ারম্যানের পাশাপাশি ১৪ জন সদস্যকেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৫ সালের ৮ জুলাই জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের অস্থায়ী চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন শেফালিকা ত্রিপুরা। নতুন প্রজ্ঞাপনে তাঁর নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে।
নতুন সদস্যরা হলেন খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. নুরুল আবছার, জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক মো. আ. মালেক, জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক মোশাররফ হোসেন, জেলা বিএনপির সহ সভাপতি ক্ষেত্র মোহন রোয়াজা, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক খনি রঞ্জন ত্রিপুরা, জেলা বিএনপির সহ–আইনবিষয়ক সম্পাদক রিপল চাকমা, দীঘিনালা উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি শান্তিপ্রিয় চাকমা, জেলা বিএনপির সহসভাপতি দেব রানী চাকমা, মাটিরাঙ্গা পৌর বিএনপির সহসভাপতি নারায়ণ ত্রিপুরা, জেলা বিএনপির কর্মসংস্থানবিষয়ক সম্পাদক রুমেল মারমা, মংসাপ্রু চৌধুরী, সদর উপজেলা কৃষক দলের সভাপতি ক্যরী মগ, জেলা মহিলা দলের সাংগঠনিক সম্পাদক তাছলিমা সিরাজ সিমা ও সভাপতি কুহেলী দেওয়ান।
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা পরিষদের প্রথম ও একমাত্র নির্বাচন হয়েছিল ১৯৮৯ সালে। ওই সময়ে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান স্থানীয় সরকার পরিষদ থেকে নির্বাচিত হয়েছিল পরিষদ। ওই পরিষদের মেয়াদ ছিল তিন বছর। ১৯৯৮ সালে মেয়াদ বাড়িয়ে পাঁচ বছর করা হয়। নির্বাচিত জেলা পরিষদে একজন চেয়ারম্যান ও ৩২ জন সদস্য থাকার কথা। বর্তমানে একজন চেয়ারম্যানসহ ১৫ সদস্যের মনোনীত পরিষদ পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো পরিচালনা করছে।
পার্বত্য জেলা পরিষদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে স্থানীয় সরকার ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কার্যক্রমের সমন্বয় এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন পর্যালোচনা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্য, কৃষি ও বন, পশুপালন, মৎস্য, সমবায়, শিল্প-বাণিজ্য, সমাজকল্যাণ ও সংস্কৃতির উন্নয়নে কার্যক্রম গ্রহণও পরিষদের দায়িত্ব। এ ছাড়া স্থানীয় সড়ক, সেতু-কালভার্ট, খেয়াঘাট, পানি সরবরাহ ও নিষ্কাশন, সেচ, পরিবেশ সংরক্ষণ, ভূমি ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় পর্যটন, যুবকল্যাণ, জুমচাষসহ বিভিন্ন জনহিতকর ও উন্নয়নমূলক কাজ পরিচালনার দায়িত্ব রয়েছে পরিষদের।