পঞ্চগড়ের বিস্তীর্ণ চা–বাগানে প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততার সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো শ্রমজীবী মানুষের জীবন। চা-পাতা সংগ্রহ থেকে শুরু করে বাগানের নানা কাজে তাঁদের শ্রমেই এগিয়ে চলে পুরো ব্যবস্থাপনা। দীর্ঘদিন ধরে এসব শ্রমিকের বেতন পরিশোধের ক্ষেত্রে ক্যাশ টাকা, অপেক্ষা এবং নির্দিষ্ট সময়ে টাকা হাতে পাওয়ার প্রক্রিয়া ছিল বহুলভাবে দেখা। এবার সেই ধরণে পরিবর্তন এসেছে বলে জানানো হয়েছে।
দেশের সর্ব–উত্তরে অবস্থিত কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটের শ্রমিকেরা এখন তাঁদের বেতন পাচ্ছেন বিকাশের ডিজিটাল ওয়ালেটে। প্রথমবারের মতো দেশে কোনো চা–বাগানের শ্রমিকদের ডিজিটাল ওয়ালেটে বেতন দেওয়ার এই উদ্যোগ অর্থ পরিশোধের পদ্ধতিতে বদল আনলেও তা যেন শুধু লেনদেনে সীমাবদ্ধ নয়—বলার চেষ্টা করা হয়েছে দৈনন্দিন আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নতুন অভ্যাস গড়ে তোলার দিকটিও।
আগে বেতন পাওয়ার জন্য শ্রমিকদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। ক্যাশ টাকা হাতে পৌঁছানোর প্রক্রিয়ায় সময়ের সঙ্গে যুক্ত থাকত অর্থ বহনের ঝুঁকি ও বিভিন্ন ধরনের ভোগান্তির সম্ভাবনা। এখন নির্ধারিত সময়ে বেতন সরাসরি ডিজিটাল ওয়ালেটে পৌঁছে যাওয়ায় অপেক্ষার প্রয়োজন কমে আসছে বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন।
বিকাশে বেতন পাওয়ার সুবিধার বিষয়ে কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটের চা–শ্রমিক মাজেদুর রহমান বলেন, ‘এটা যদি আরও আগে হতো, তাহলে আমাদের জন্য ভালো হতো। এখন যেভাবে বেতনের টাকা পাচ্ছি, এতে আমাদের অনেক সুবিধা হয়েছে। আমার যতটুকু টাকা প্রয়োজন, ততটুকুই খরচ করছি। আর বাকি টাকা পরবর্তী সময়ের জন্য রেখে দিতে পারছি।’
তবে পরিবর্তনের প্রভাব শুধু বেতন পাওয়ার সুবিধায় সীমাবদ্ধ নয় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। ডিজিটাল ওয়ালেটে অর্থ পাওয়া গেলে শ্রমিকদের নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী টাকা ব্যবহারের সুযোগ সহজ হয় বলে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ধীরে ধীরে ডিজিটাল লেনদেনের সঙ্গে পরিচিতির প্রসঙ্গও এসেছে।
আগের বেতন গ্রহণের প্রক্রিয়া আর বর্তমান ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরে কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটের আরেক শ্রমিক বানু আক্তার বলেন, ‘এখন মোবাইলেই বেতনের টাকা চলে আসছে। যখন প্রয়োজন হচ্ছে, তখনই টাকা তুলে নিতে পারছি। আগে বেতন তুলতে অফিসে যেতে হতো, অনেক সময় সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। এখন মোবাইলেই টাকা পেয়ে যাচ্ছি, তাই আমাদের জন্য অনেক সুবিধা হয়েছে।’
বেতন দেওয়ার পদ্ধতির পরিবর্তন বাগান কর্তৃপক্ষের কাজের ধরনেও প্রভাব ফেলেছে বলে বলা হচ্ছে। আগের ব্যবস্থায় ৯টি ডিভিশনে আলাদাভাবে শ্রমিকদের হাতে বেতন পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি ছিল প্রাসঙ্গিক। পঞ্চগড় শহর থেকে ক্যাশ টাকা এনে তা বিতরণ করা সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া ছিল। নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে একই ধরনের কাঠামোর আওতায় একসঙ্গে বেতন দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
ক্যাশের বদলে বিকাশে বেতন দেওয়ার ফলে নিরাপত্তা–সুবিধার পাশাপাশি সময় সাশ্রয়ের কথাও উঠে এসেছে। কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফাইন্যান্স বিভাগের ম্যানেজার মুন্সি মো. আল ইমরান হোসেন বলেন, ‘নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের কাছে প্রথম অগ্রাধিকার ছিল। আগে যে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার বিষয়টি ছিল, সেটি এখন সমাধান হয়েছে। পাশাপাশি আমরা খুব সহজেই এবং নির্বিঘ্নে বেতন দিতে পারছি। এক ক্লিকেই একই সময়ে সবার কাছে বেতনের টাকা চলে যাচ্ছে।’
মুন্সি মো. আল ইমরান হোসেন আরও বলেন, ‘আমাদের অনেক স্টাফ ও শ্রমিক রয়েছেন। তাঁদের যদি একজন একজন করে টাকা দিতে যেতাম, তাহলে দেখা যেত তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লেগে যাচ্ছে। এখন আমরা সেই সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছি।’
বিকাশের পে-রোল সলিউশনের মাধ্যমে বেতন ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল হওয়ায় অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়ায় নতুন গতি এসেছে বলে জানানো হয়। শ্রমিকদের জন্য এটি বেতন পাওয়ার সহজ মাধ্যম হিসেবে দেখা হলেও একই সঙ্গে বাগান কর্তৃপক্ষের বেতন ব্যবস্থাপনাকে আরও গোছানো করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে—এমনটাই বলা হচ্ছে।
বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের বেতন পরিশোধে নতুন এই ব্যবস্থার সুবিধা ব্যাখ্যা করে কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটের অপারেশনস ম্যানেজার প্রদীপ কুমার ভার্মা বলেন, ‘আমাদের ৯টি ডিভিশনে প্রায় ৪৪৫ হেক্টর এলাকায় স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে প্রায় ৬০০ জন শ্রমিক কাজ করেন। তাঁদের বেতন এক দিনে পরিশোধ করা বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। এর জন্য আলাদা লোকবলও প্রয়োজন হতো। সবকিছু বিবেচনায় এখন বিকাশের মাধ্যমে বেতন পরিশোধ করায় আমাদের কাজ অনেক সহজ হয়েছে।’
বেতন পাওয়ার পর অর্থ কেবল ক্যাশ টাকা হিসেবে হাতে নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না বলেও বলা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জসহ দৈনন্দিন বিভিন্ন সেবায় বিকাশ ব্যবহারের সুযোগ থাকায় শ্রমিকদের আর্থিক লেনদেনের পরিধি বাড়তে পারে—এমন দিকটিও উল্লেখ করা হয়েছে।
চা–শ্রমিকদের বিকাশে বেতন পাওয়ার মাধ্যমে মূলধারার আর্থিক সেবার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরির কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে বিকাশের চিফ কমার্শিয়াল অফিসার আলী আহম্মেদ বলেন, চা–শ্রমিকেরা বিকাশে শুধু বেতন পাওয়ার একটি নতুন মাধ্যমই পাচ্ছেন না, বিকাশের অন্যান্য সেবাগুলোও ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন। অর্থাৎ, দেশের অন্যান্য মানুষ বিকাশের যেসব সুবিধা ভোগ করছেন, চা–শ্রমিকেরাও এখন সেসব সুবিধার আওতায় আসছেন। এর ফলে তাঁরা আর্থিক সেবার মূলধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার এবং নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজিটাল আর্থিক সেবা ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পঞ্চগড়ের চা–বাগানে শুরু হওয়া এ পরিবর্তনটি শুধু প্রযুক্তি প্রয়োগের বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সময়ের সাশ্রয়, অর্থ ব্যবস্থাপনার স্বাধীনতা এবং শ্রমজীবী মানুষের ক্রমে ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ার বাস্তব অভিজ্ঞতার দিকও। ক্যাশ টাকানির্ভরতা থেকে ডিজিটাল লেনদেনে যাওয়ার এই যাত্রা শ্রমজীবী মানুষের আর্থিক জীবনে নতুন অভ্যাস ও সম্ভাবনার পথ তৈরি করতে পারে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।