বাংলাদেশ দলের মধ্যে ডারউইন টেস্টের জয়ের পর বাড়তি উল্লাস নেই, আবার ম্যাকাই টেস্ট নিয়ে শঙ্কাও নেই। গ্রুপের মধ্যে আলোচনায় উঠে আসে—ওই টেস্টটা ‘বোনাস’ হিসেবেই এসেছে।

‘ওইটা তো বোনাস জেতা জিতে গেছি! আসল প্রস্তুতিটা কিন্তু আমরা এই টেস্টের জন্যই নিয়েছি।’

গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনা থেকে খুব দূরে নয় কফি শপ লাফোস কুকিজে কাল বিকেলে কফি খেতে খেতে হাতের ইশারায় দ্বিতীয় টেস্টের ভেন্যুর দিকে কথাটা ইঙ্গিত করেন বাংলাদেশ দলের টিম ম্যানেজমেন্টের এক সদস্য। তিনি যে কথা বলছেন, সেটাই বোঝাতে চাচ্ছিল দল। ডারউইনের মতো কন্ডিশনে খেলা হলেও অস্ট্রেলিয়া সিরিজের প্রস্তুতির সময় বাংলাদেশ দল সেই পরিবেশকে ধরে নেয়নি—এমনই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তাদের মাথায় ছিল প্রথাগত অস্ট্রেলিয়ান কন্ডিশন; সেখানে বাংলাদেশ দলের ব্যাটসম্যানদের জন্য পেস–বাউন্সের ঝুঁকি বাড়ে, আর নতুন বলে সকালের সেশনে উইকেট টিকিয়ে রাখাটাই বড় চ্যালেঞ্জ।

মারাারা স্টেডিয়ামের উইকেট বাংলাদেশ ব্যাটসম্যানদের তেমন কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেনি। এ কারণেই জয়ের প্রসঙ্গের সঙ্গে ‘বোনাস’ শব্দটি যুক্ত হয়। ভাবনাটা এমন, সহজ প্রশ্নপত্রে ‘এ প্লাস’ পাওয়ার মতো। তবে গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনার সবুজ গতিময় উইকেটের পরীক্ষায় প্রশ্ন সহজ হওয়ার সম্ভাবনা কম—এমন উপলব্ধিও ছিল। এই কন্ডিশনে অস্ট্রেলিয়ান ফাস্ট বোলিং ব্যাটিংয়ে ছুরির মতো ধার বসাতে পারে। তবু বাংলাদেশ যদি প্রস্তুতির পরিকল্পনায় এসব বিষয় সত্যিই মাথায় রেখে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি হতে পারে ভিন্ন। টিম ম্যানেজমেন্টের ওই সদস্যের কথায় তাই আস্থা খুঁজতে চাইছেন দলের ভেতরের লোকজন।

ম্যাকাইয়ে এসে বাংলাদেশ দল এখনো মাঠে নামেনি। উইকেটও দেখা হয়নি। আজ স্থানীয় সময় বেলা ১টায় অনুশীলন শুরু হওয়ার পর মাঠ-উইকেট দেখে নিয়ে কাজ শুরু হবে। পরশু দীর্ঘ বিমানযাত্রার পর ম্যাকাই পৌঁছে কাল কেবল জিম করেছেন ক্রিকেটাররা। শহরের ফিটনেস কার্টল হেলথ ক্লাবস; সংক্ষেপে এফসিতে ঘণ্টা দেড়েকের ‘ওয়ার্কআউট’ দিয়ে শুরু হয়েছে ম্যাকাই টেস্টের চূড়ান্ত প্রস্তুতি।

একটা দল যখন এক হয়ে খেলে, কারও দলে থাকা না থাকা, প্রত্যাশা বা যা কিছু্ই বলুন—সব আসলে একই সুতোয় গাঁথা থাকে।

দ্বিতীয় টেস্টের দল কেমন হতে পারে—উইকেট না দেখে সে সম্পর্কে আলোচনা করার সুযোগ নেই। তাই জিম শেষে যে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার জন্য পেসার শরীফুল ইসলামকে পাঠানো হলো, সেটির অন্য কোনো অর্থ থাকার কথা নয়। ডারউইনে বিশাল ব্যবধানে জিতে আসার পরও এখানে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, যাতে উইনিং কম্বিনেশন ভাঙার প্রয়োজন পড়ে।

শরীফুল সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রশ্নকর্তার ভূমিকায় দেখা যায় দলের অভিজ্ঞ ক্রিকেটার মুমিনুল হককে। মজা করার উদ্দেশ্যেই আসলে। পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের থামিয়ে তাঁর প্রশ্ন, ‘আমি একটা প্রশ্ন করি, আপনার প্রত্যাশা কী?’ মুমিনুলের মুখে প্রশ্ন শুনে প্রথমে একটু অপ্রস্তুত হলেও পরে মজাটা বুঝতে পেরে নিজেকে সামলে নেন শরীফুল।

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এ ধরনের মজার ধাক্কা আরও একবার খেতে হয় শরীফুলকে। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন যেতে যেতে বললেন, ‘আরে ও তো ইলেভেনেই ছিল না, ওর সঙ্গে কী কথা বলেন!’ এবারও অবশ্য শরীফুল কিছু না বলে হেসে দেন।

একটা দল যখন এক হয়ে খেলে, কারও দলে থাকা না থাকা, প্রত্যাশা বা যা কিছু্ই বলুন—সব আসলে একই সুতোয় গাঁথা থাকে। দুষ্টুমির আড়ালে আসলে যে কী থাকে, সেটা আর কেউ না জানলেও শরীফুল–নাজমুল–মুমিনুলরা ঠিকই জানেন। আড়ালে কিছু না থাকলে, জানেন সেটাও।

১৩৯ বছরে যা হয়নি, ম্যাকাইয়ে কি সেটাই করে দেখাতে পারবে বাংলাদেশ—এ প্রশ্নও ঘুরে বেড়াচ্ছে দলের আলোচনায়। মাঠে একসঙ্গে খেললেও হেরে গেলে ক্রিকেটারদের মনোভাব বদলে যায়, আর জিতলে সেটাও আলাদা। সংবাদমাধ্যমে প্রশ্নের ধরণও তখন সরে আসে। যেমন হারের পর কখনো একাদশে না থাকা খেলোয়াড়কে জিজ্ঞাসা করা হয় না, ‘আপনি তো খেলেননি, আপনার কেমন লাগছে?’

কিন্তু জিতলে বেঞ্চে থাকা খেলোয়াড়ের কাছেও জানতে ইচ্ছা করে—মাঠে না থেকে জয়টা তিনি কীভাবে উদ্​যাপন করলেন। উত্তরগুলো বেশির ভাগ সময়েই গৎবাঁধা হয়। তবে শরীফুল বললেন ভিন্নভাবে, ‘আলহামদুলিল্লাহ, এমন একটি জয়ের অংশ হতে পেরে ভালো লাগছে। অন্তত স্কোয়াডের সঙ্গে ছবিতে তো থাকতে পেরেছি! আমরা এই ধারা বজায় রাখার চেষ্টা করব। দেখা যাক, কত দূর যেতে পারি।’

শরীফুলের ভালো লাগার আরেকটি কারণ পেসারদের পারফরম্যান্স। প্রথম টেস্টে তিনি না খেললেও সম্মিলিতভাবে যে বাংলাদেশ দলে পেস বোলিং প্রশংসায় ভাসছে, সেটার সঙ্গে শরীফুলও বাদ পড়ছেন না—এমন ভাবনার কথাই উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘পেসাররা ভালো করলে অবশ্যই ভালো লাগে। শুধু পেসার নয়, বাংলাদেশ দল যখন ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং—তিন বিভাগেই ভালো করে, তখন বেশি ভালো লাগে। আমরা যখন সম্মিলিতভাবে পারফর্ম করি, তখনই জয় ছিনিয়ে আনা সম্ভব হয়।’

ম্যাকাইয়ের ঠান্ডায় অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ কী করবে—ডারউইন টেস্ট প্রসঙ্গে শরীফুলের কথাগুলো এসেছে প্রশ্নের জবাবে, প্রসঙ্গক্রমে। নইলে বাংলাদেশ দলের মধ্যে এখন না আছে ডারউইন টেস্টের জয় নিয়ে মাতামাতি, না আছে সামনের ম্যাকাই টেস্ট নিয়ে শঙ্কা। বলা যায়—দলটি নিরপেক্ষ অবস্থায় আছে; সেখান থেকে শুধু দেখা হচ্ছে—২২ আগস্ট গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায় শুরু হবে দ্বিতীয় টেস্ট।

প্রতিপক্ষের ‘গ্রেট’রা সেই টেস্টে কতটা মরণকামড় দেবেন, নাকি আরও একটি ‘গ্রেট টেস্ট ম্যাচ’ খেলে ফেলেন নিজেরাই—এ নিয়ে বাংলাদেশ ভাবছে না।