বন্ধ কারখানা ফের সচল করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও অর্থনীতিতে গতি আনার লক্ষ্যে সরকারের উদ্যোগে নতুন অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) আওতাধীন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা নীলফামারীর দারোয়ানী ও মাগুরা টেক্সটাইল মিল দুটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) পদ্ধতিতে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এগুচ্ছে।
৩০ বছর মেয়াদি আলাদা চুক্তির ভিত্তিতে মিল দুটি পরিচালনা ও পুনরুজ্জীবিত করবে প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের প্রাণ–আরএফএল গ্রুপ ও ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেড।
আজ বুধবার অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিইএ) বৈঠকে মিল দুটি হস্তান্তরের চূড়ান্ত চুক্তির নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বিটিএমসির তথ্য অনুযায়ী, ৩৭ দশমিক ৮৬ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত নীলফামারীর দারোয়ানী টেক্সটাইল মিলটি ১৯৮০ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত চালু ছিল। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর মিলটি আবার সচল করতে ‘ডিজাইন, বিল্ড, ফাইন্যান্স, অপারেট, মেইনটেইন অ্যান্ড ট্রান্সফার’ (ডিবিএফএমটি) পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়। কারিগরি ও আর্থিকভাবে উপযোগী বিবেচিত হওয়ায় ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেড প্রোডাক্টস বিডি লিমিটেডকে ৩০ বছরের জন্য চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তৌহিদ বিন আবদুস সালাম বলেন, ‘আমরা নেদারল্যান্ডসের একটি কোম্পানি থেকে বিনিয়োগ নিয়ে আসব। সেখানে পরিবেশবান্ধব কারখানা গড়ে এলাকার উন্নয়ন করব। সরকারের সিদ্ধান্তের পর আমরা দ্রুত কাজ শুরু করব।’
জানা গেছে, এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনো অর্থ ব্যয় হবে না। জমি লিজ দেওয়ার বিপরীতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থ প্রদান করবে। ভূমি ব্যবহারের এককালীন ‘সাইনিং মানি’ হিসেবে ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেড বিটিএমসিকে ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা দেবে। তিন বছরের গ্রেস পিরিয়ড শেষে প্রতিষ্ঠানটি প্রতি মাসে ১২ লাখ ৯১ হাজার ৬৬৭ টাকা বিটিএমসিকে চুক্তি ফি দেবে। এ ছাড়া পিপিপি কর্তৃপক্ষকে ৭৫ লাখ টাকা ডেভেলপমেন্ট ফি এবং বিটিএমসিকে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি দেওয়ার কথা আছে।
বৈঠকের তথ্য অনুযায়ী, বন্ধ কারখানা দুটি চালু হবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি)। দারোয়ানাী টেক্সটাইল মিলে ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেড। কর্মসংস্থান হবে তিন হাজার মানুষের। পাশাপাশি বিটিএমসির ২৫টি বন্ধ বা অলাভজনক মিলের ১৬টি পিপিপিতে পুনরুজ্জীবনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি মিলটিতে প্রায় ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব সুতা ও বস্ত্র কারখানা গড়ে তুলবে। এতে ওই অঞ্চলে সরাসরি অন্তত তিন হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ১৬ একর জমিতে স্থাপিত মাগুরা টেক্সটাইল মিল ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত চালু ছিল। এটি আগামী ৩০ বছর পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছে ‘চরকা টেক্সটাইল লিমিটেড’র মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানটি প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান।
এর আগে গত মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত সভায় আইনি জটিলতার কারণে এ হস্তান্তর স্থগিত রেখেছিল মন্ত্রিসভা কমিটি। পরে গত ১৬ জুলাই নতুন ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’ গেজেট আকারে জারি হওয়ায় সে আইনি বাধা দূর হয়।
মাগুরা মিলের ক্ষেত্রে চরকা টেক্সটাইল বিটিএমসিকে সাইনিং মানি হিসেবে এককালীন ৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা দেবে। তিন বছরের গ্রেস পিরিয়ড শেষে বিটিএমসি বার্ষিক ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা কন্টাক্ট ফি পাবে। এ ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি হিসেবে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং পিপিপি কর্তৃপক্ষকে ৫০ লাখ টাকা ডেভেলপমেন্ট ফি দেবে চরকা। তারাও আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন পরিবেশবান্ধব কারখানা গড়ে তুলবে।
বিটিএমসির নিয়ন্ত্রণাধীন বন্ধ বা অলাভজনক ২৫টি কারখানার মধ্যে ১৬টি মিলকে পিপিপি পদ্ধতিতে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। এর আগে চারটি মিল বেসরকারি অংশীদারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। নীলফামারী ও মাগুরার দুটি যুক্ত হওয়ায় এ সংখ্যা দাঁড়াল ছয়টিতে।
আজ বুধবার মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে আরও কিছু প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের এক কার্গো এলএনজি আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড ১ থেকে ২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই এলএনজি সরবরাহ করবে। প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ধরা হয়েছে ২৩ দশমিক ৯৩ মার্কিন ডলার।
বৈঠকে রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে সাতটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মোট ১৪ কার্গো এলএনজি কেনার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে মোট ১ লাখ ১৫ হাজার টন এমওপি সার আমদানির অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা কমিটি। এর মধ্যে কানাডার ‘কানাডিয়ান কমার্শিয়াল করপোরেশন’ (সিসিসি) থেকে ৮০ হাজার টন এবং রাশিয়ার ‘জেএসসি ফরেন ইকোনমিক করপোরেশন’ থেকে ৩৫ হাজার টন এমওপি সার আনা হবে। উভয় ক্ষেত্রে প্রতি টনের দাম পড়বে ৩৭৭ দশমিক ৬৩ মার্কিন ডলার।
এ ছাড়া সৌদি আরবের ‘এসএবিআইসি অ্যাগ্রি-নিউট্রিয়েন্টস কোম্পানি’ থেকে প্রতি টন ৪৩০ মার্কিন ডলার দরে ইউরিয়া সার আমদানির প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। এতে মোট ব্যয় হবে ২১৩ কোটি ১৯ লাখ টাকার বেশি।
বাণিজ্যিক প্রয়োজনে স্থানীয়ভাবে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে ২ কোটি লিটার বা ২০ হাজার টন পরিশোধিত পাম অলিন কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। শবনাম ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ এ তেল সরবরাহ করবে। এতে ব্যয় হবে ৩৬৮ কোটি টাকা এবং প্রতি লিটারের দাম পড়বে ১৮৪ টাকা।