প্রবাসী অধ্যুষিত জেলা হিসেবে সারাদেশে সুপরিচিত ফেনী। এ জনপদের প্রায় প্রতিটি ঘরেই রয়েছেন প্রবাসী সদস্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে—বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে—কর্মরত রয়েছেন বিপুল পরিমাণ ফেনীবাসী। প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন তারা। রেমিট্যান্স অর্জনে জেলাভিত্তিক তালিকায় শীর্ষ সারিতে থাকা সত্ত্বেও দেশে ফিরলে প্রবাসীরা পান পদে পদে অবহেলা ও জটিলতা। একইসঙ্গে প্রয়োজনীয় সামাজিক সুরক্ষার অভাবে পোহাতে হয় চরম ভোগান্তি। এ নিয়ে প্রবাসীদের অভিযোগের অন্ত নেই। যাদের রক্তঘামে ফেনী আজ সমৃদ্ধ জনপদ, সেই ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধারা’ নিজ ভূমিতেই যেন পরবাসী।

জেলা জনশক্তি কার্যালয়ের তথ্যমতে, ফেনীর মোট জনসংখ্যা ১৬ লাখ ৪৮ হাজার ৮৯৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৭ লাখ ৮০ হাজার ৪৩৬ জন এবং নারী ৮ লাখ ৬৮ হাজার ৪১৬ জন। সরকারি খাতায় নিবন্ধিত প্রবাসীর সংখ্যা সাড়ে তিন লাখ ছাড়ালেও বাস্তবে ফেনীর প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ মানুষ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছেন। মধ্যপ্রাচ্যের সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব থেকে শুরু করে ইউরোপ, আমেরিকা ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে রয়েছে তাদের বিচরণ।

ব্যাংকিং সূত্রে জানা যায়, প্রতি বছর ফেনীতে ব্যাংকিং চ্যানেলে আসছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। জেলার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে আমানত ও রেমিট্যান্স প্রবাহের হার ঈর্ষণীয়। দেশের প্রায় সব সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের শাখা রয়েছে ফেনী শহরে। এসব ব্যাংকের মাধ্যমে প্রতিদিন লেনদেন হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। বিশেষ করে ঈদ উৎসবে প্রতিটি ব্যাংকে প্রবাসী পরিবারগুলোর ভিড় লেগে থাকে। তাছাড়া পরিবারগুলোর প্রতিমাসের সংসার খরচ ও জীবনযাত্রার মূল চালিকাশক্তি প্রবাসীদের পাঠানো এই অর্থ, যা দেশের জন্য অর্জন করছে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা।

প্রবাসীদের অভিযোগ, কাগজে-কলমে তাদের ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ ও অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বলা হলেও বাস্তবে স্থানীয় সেবাকেন্দ্রগুলোতে প্রবাসীদের জন্য কোনো বিশেষ সুবিধা নেই। বিদেশে যাওয়ার আগে জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস, পাসপোর্ট কার্যালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে তারা প্রতিনিয়ত সার্ভার জটিলতা, দালালের দৌরাত্ম্য ও অহেতুক হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এছাড়া পাসপোর্ট নবায়ন ও ফিঙ্গারপ্রিন্টের জন্য দীর্ঘ সারি এবং অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়ার নামে ভোগান্তি পোহাতে হয়।

প্রবাসে থাকা অবস্থায় দেশে থাকা জমিজমা দখল বা পারিবারিক বিরোধে প্রবাসীদের পরিবার সঠিক আইনি সহায়তা পায় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন ও লাগেজ খালাসে হয়রানি এবং প্রবাসে কোনো কর্মী মারা গেলে তার মরদেহ আনা কিংবা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ক্ষেত্রে পরিবারকে পোহাতে হয় দীর্ঘ প্রশাসনিক ভোগান্তি। এসব সমস্যা থেকে নিস্তার পেতে প্রশাসনিক সহযোগিতা কামনা করেছেন তারা।

হয়রানির কথা জানিয়ে কুয়েত প্রবাসী ওমর ফারুক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, আমার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর ফেনী পাসপোর্ট অফিসে গেলে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। বাধ্য হয়ে দালালের মাধ্যমে পাসপোর্ট নবায়ন করেছি। প্রবাসীদের যদি এভাবে হয়রানি করা হয়, তবে আমরা কার কাছে বিচার চাইব?

দীর্ঘ ৩৬ বছর প্রবাসে কাটানো সৌদি প্রবাসী আবদুল হক কালামিয়া জানান, দেশে এসে দেখি আমার পৈতৃক বাড়িসহ সব সম্পত্তি বেদখল হয়ে গেছে। সম্পত্তি উদ্ধারে গেলে উল্টো প্রতিপক্ষ আমার নামে আদালতে মামলা করে দেয়। একজন প্রবাসী হিসেবে আমি সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতা পাইনি। এভাবেই চলছে হাজারো প্রবাসীর জীবন।

দক্ষিণ আফ্রিকা ফেরত প্রবাসী আবুল মনছুর আহাদ জানান, তিনি জীবনের মূল্যবান ১৪টি বছর কাটিয়েছেন প্রবাসে। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকায় আল মনছুর টেক অ্যাওয়ে নামে ফাস্টফুডের ব্যবসা করে কষ্টার্জিত ২ কোটি ১৭ লাখ ৯৮ হাজার ৭৯ টাকা মেজো ভাইয়ের কাছে পাঠান। দেশে ফিরে ফ্ল্যাট, জমি ও গাড়ি কিনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও ভাই সে টাকা দিয়ে নিজের নামে সম্পদ গড়ে তোলেন এবং তাকে কোনো হিসাব না দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেন।

এ বিষয়ে সম্প্রতি ফেনী প্রেসক্লাবে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে কান্নাকণ্ঠে আবুল মনছুর বলেন, প্রবাসে জীবনের সোনালি সময়গুলো পরিবারের জন্য উৎসর্গ করেছি। আজ সেই উপার্জনের হিসাব চাইতে গিয়ে আমি নিঃস্ব ও অসহায়। আমি শুধু আমার কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত চাই।

একইভাবে কাতার প্রবাসী নুরুল আফছার অভিযোগ করেন, সোনাগাজীর মঙ্গলকান্দি ইউনিয়নে কেনা জমিতে বাড়ি তুলতে গিয়ে তিনি স্থানীয় প্রভাবশালী ও বিক্রেতার আত্মীয়দের দ্বারা মামলা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রবাসীদের অর্জিত অর্থ কেবল বাড়িঘর তৈরিতে সীমাবদ্ধ না রেখে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতে ব্যবহারে সরকারি 'মাস্টারপ্ল্যান' প্রয়োজন। ফেনীতে একটি বিশেষায়িত ‘প্রবাসী সেবা সেল’ গঠন এবং সরকারি দপ্তরগুলোতে ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ চালু করা জরুরি। এতে নতুন উদ্যোক্তারা কৃষি, ডেইরি, মৎস্য ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পে সহজে বিনিয়োগ করতে পারবেন।

জাতীয়তাবাদী প্রবাসী ফোরাম কুয়েতের সভাপতি আবদুল্লাহ ওমর ফায়দা (জুয়েল) মুক্তকণ্ঠকে বলেন, পরিবার রেখে আমরা প্রবাসে থাকি, অথচ দেশে আমাদের স্বজনদের হয়রানি করা হয়। একটি কার্যকর প্রবাসী সেল গঠন করা হলে আমরা প্রবাসীরা উপকৃত হতাম।

ফেনী জেলা শ্রম ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ দিদার মিয়া মুক্তকণ্ঠকে জানান, ২০০৫ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ৩ লাখ ৫৫ হাজার ৮৭৬ জন বিদেশ গমনেচ্ছু কর্মীর রেজিস্ট্রেশন ও ফিঙ্গার ইমপ্রেশন নেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৭ হাজার ১০৬ জন নিবন্ধিত হয়েছেন।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. আল-আমিন সরকার এশিয়ান পোস্টকে বলেন, প্রবাসীদের কল্যাণ ও অধিকার সংরক্ষণে জেলা প্রশাসন অনলাইন নিবন্ধন, অভিযোগ নিষ্পত্তি, ক্ষতিপূরণ ও পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সংক্রান্ত সেবা দিচ্ছে। নিরাপদ অভিবাসন, বিদেশ ফেরতদের পুনঃএকত্রীকরণ এবং প্রবাসী বিনিয়োগে উৎসাহ দিতে জেলা প্রশাসনের নানা উদ্যোগ রয়েছে।