পাবনা জেলার ১ হাজার ১৩৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬১৬টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। অর্থাৎ জেলার প্রায় ৫৪ শতাংশ বিদ্যালয় বর্তমানে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই পদগুলো শূন্য থাকায় বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম, উন্নয়নকাজ এবং পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
পাবনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার নয়টি উপজেলায় মোট ১ হাজার ১৩৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৫২২টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক কর্মরত আছেন এবং বাকি ৬১৬টি বিদ্যালয়ে এই পদ শূন্য।
উপজেলাভিত্তিক তথ্যানুসারে, সবচেয়ে বেশি শূন্য পদের প্রভাব দেখা গেছে সাঁথিয়া, সুজানগর, চাটমোহর ও বেড়া উপজেলায়। সাঁথিয়ার ১৭৮টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮৪টিতে প্রধান শিক্ষক থাকলেও শূন্য রয়েছে ৯৪টি পদ। সুজানগরের ১৪৫টির মধ্যে ৫২টিতে প্রধান শিক্ষক আছেন এবং শূন্য ৯৩টি। চাটমোহরের ১৫৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৫টিতে প্রধান শিক্ষক কর্মরত এবং শূন্য ৯০টি। বেড়ার ১১২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৮টিতে প্রধান শিক্ষক আছেন এবং শূন্য রয়েছে ৭৪টি পদ।
এছাড়া পাবনা সদরের ১৮৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১১৪টিতে প্রধান শিক্ষক কর্মরত ও ৭১টি পদ শূন্য। ভাঙ্গুড়ার ৯৯টির মধ্যে ৪৫টিতে প্রধান শিক্ষক আছেন এবং শূন্য ৫৪টি। ঈশ্বরদীর ১০০টির মধ্যে ৫১টিতে প্রধান শিক্ষক আছেন ও শূন্য ৪৯টি। ফরিদপুরের ৮৪টির মধ্যে ৩৬টিতে প্রধান শিক্ষক কর্মরত এবং শূন্য ৪৮টি। আটঘরিয়ার ৭৮টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৭টিতে প্রধান শিক্ষক আছেন এবং শূন্য রয়েছে ৪১টি পদ।
শিক্ষকদের মতে, নতুন জাতীয়করণ করা বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশ জ্যেষ্ঠতার দাবি জানিয়ে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ বা পদোন্নতির বিষয়ে মামলা করেছেন। এই আইনি জটিলতার কারণে পদোন্নতির প্রক্রিয়া আটকে আছে। তবে যেসব জেলায় এ ধরনের মামলা নেই, সেখানে শূন্য পদ পূরণের কাজ এগিয়ে চলছে।
শিক্ষকরা আরও জানান, প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে সহকারী শিক্ষকদের কাউকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে সহকর্মীদের মধ্যে তা সহজভাবে নেওয়া হয় না, যা প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও দাপ্তরিক জটিলতা তৈরি করে। এছাড়া প্রধান শিক্ষক না থাকায় নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে, ফলে সামগ্রিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষক জানান, দীর্ঘকাল পদোন্নতি না হওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে, যা পাঠদানের প্রতি অনাগ্রহ সৃষ্টি করেছে। অনেকে পাশাপাশি ব্যবসা বা কৃষিকাজে জড়িয়ে পড়ায় নিয়মিত স্কুলে আসেন না অথবা দ্রুত স্কুল ত্যাগ করেন। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে বিদ্যালয় পরিচালনায় প্রশাসনিক জটিলতা বাড়ায় কাজের উৎসাহ কমে যাচ্ছে।
বিদ্যালয়ের উন্নয়ন বরাদ্দের বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষকেরা। তাঁদের দাবি, দুই বছর আগে বছরে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হলেও বর্তমানে তা কমে ১৫ হাজার টাকায় নেমেছে, যার ফলে প্রয়োজনীয় উন্নয়নকাজ ও আনুষঙ্গিক খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষকের অভাবে পড়াশোনা ও শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। শিক্ষকরা সময়মতো স্কুলে আসছেন না, ফলে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে এবং তারা সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত।
পাবনা সদরের দাশপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আতিয়ার হোসেন বলেন, “একটি বিদ্যালয়ের অভিভাবক হলেন প্রধান শিক্ষক। বাড়ির যদি অভিভাবকই না থাকেন, তাহলে ওই বাড়িটির কী অবস্থা হবে। প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ে পড়াশোনার কোনো পরিবেশই থাকে না। যে যার মতো, সে সে খেয়ালখুশিমতো পাঠদান করে দায়সারাভাবে কাজ করে চলে যায়।” তিনি দ্রুত পদোন্নতির জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
পাবনা সদর উপজেলার চরতারাপুর ইউনিয়নের দিঘিগোহাইলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ফারুক হোসেন বলেন, “আমার বিদ্যালয়ে ২০১৭ সাল থেকে প্রধান শিক্ষক নেই। এই গ্রামের নাম দাশপাড়া হলেও বিদ্যালয়ের নাম দিঘিগোহাইলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় করা হয়েছে। এই জটিলতা ঠিক করতে প্রধান শিক্ষক ছাড়া সম্ভব নয়। নাম সংশোধনের কাজ করতেও নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।” তিনি জানান, প্রধান শিক্ষক না থাকায় পড়াশোনা ও উন্নয়নসহ সবক্ষেত্রেই ব্যাপক ভোগান্তি হচ্ছে।
এদিকে, বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত শিখনফল অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় জেলার ৩৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষককে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। গত ২০ থেকে ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে এসব নোটিশ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, নোটিশ পাওয়া বিদ্যালয়গুলোর বেশির ভাগেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য।
পাবনা জেলা প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আতাউর রহমান বলেন, “বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষক না থাকায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করা প্রয়োজন।” তিনি আরও বলেন, “বর্তমান বিদ্যালয়গুলোর জন্য বিষয়টি অনেকটাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক থাকা জরুরি।”