দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাস–সংকট অব্যাহত রয়েছে। নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ রাজধানীর আশপাশের জেলাগুলোতে গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় বহু কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদন সীমিত করা হয়েছে। নরসিংদী জেলায় ছোট–বড় মিলিয়ে তিন শতাধিক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

বেশ কিছুদিন ধরে ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ সারা দেশের শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন বিঘ্নিত হচ্ছে। দেশে দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত সরবরাহ করে রেশনিংয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। গত শনিবার ভোরে ২৪২ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হয়। পরদিন রোববার সরবরাহ কমে ২৪০ কোটি এবং সোমবার ২২৮ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ছয়টায় গ্যাস সরবরাহ হয়েছে মোট ২২৬ কোটি ঘনফুট।

মুক্তকণ্ঠের নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, গ্যাসের সংকটে নরসিংদীর ছোট–বড় শতাধিক শিল্পকারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের বসে থাকতে হচ্ছে। বাসাবাড়িতেও চুলা জ্বলছে না। সিএনজি পাম্পেও দীর্ঘ হচ্ছে যানবাহনের সারি।

শিল্পমালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক সপ্তাহ ধরে গ্যাসের চাপ সর্বনিম্ন পর্যায়ে আছে। কখনো কখনো তা শূন্যে নেমেছে। এত দিন বিকল্প পদ্ধতিতে অন্তত ১০ শতাংশ উৎপাদন হলেও কয়েক দিন ধরে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন শিল্পকারখানার মালিকেরা। সারা দেশে স্থানীয় কাপড়ের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ জোগান দেয় এই জেলার বস্ত্রকলগুলো। জেলায় টেক্সটাইল, ডাইং ও স্পিনিং মিলের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি।

নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি রাশিদুল হাসান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, গ্যাস না পাওয়া ছোট–বড় তিন শতাধিক শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

নরসিংদী শহর ও আশপাশের এলাকায় যেসব কারখানায় উৎপাদন বন্ধ আছে, সেসব কারখানার মধ্যে রয়েছে চিশতিয়া সাইজিং মিল, ইয়ামিন সাইজিং মিল, মমিন সাইজিং মিল, হোসেন ডাইং অ্যান্ড ক্যালেন্ডারিং মিল, আবেদ টেক্সটাইল মিলস, শিল্পী ডাইং, নদী–বাংলা সাইজিং মিল, ভূঁইয়া টেক্সটাইল অ্যান্ড ক্যালেন্ডার মিলস। এ ছাড়া মাধবদীর আমানত শাহ গ্রুপ ও পাকিজা গ্রুপের একাধিক কারখানা, এমএমকে ডাইং, মুক্তাদিন ডাইং, মাধবদী ডাইংসহ বেশ কিছু কারখানা বন্ধ আছে।

নরসিংদী টেক্সটাইল, ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও মাধবদী ডাইং ফিনিশিং মিলসের মালিক নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এভাবে চলতে থাকলে শ্রমিকদের বেতন কিংবা গ্যাস বিল কিছুই দিতে পারবেন না শিল্পমালিকেরা।

গ্যাস–সংকট দ্রুত সমাধানের তাগিদ দিয়েছেন ভূঁইয়া টেক্সটাইল অ্যান্ড ক্যালেন্ডার মিলস লিমিটেডের পরিচালক আনিসুর রহমান ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ‘সরকারের জানানো উচিত, এই সংকট কবে নিরসন হবে এবং ওই সময় পর্যন্ত আমাদের কী করা উচিত।’

২০ দিন ধরে নরসিংদীর আবেদ টেক্সটাইল মিলসের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, অসন্তোষ এড়াতে শ্রমিকদের দিয়ে যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার কাজ করানো হচ্ছে।

নরসিংদীতে তিতাস গ্যাসের আঞ্চলিক বিপণন কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মাকসুদুর রহমান বলেন, ‘নরসিংদীতে গ্যাসের চাপ নেই বললেই চলে। যেটুকু পাচ্ছি তার পুরোটাই ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরবরাহ করা হচ্ছে। গ্যাসের প্রেশার না পাওয়া গেলে এই সংকট নিরসন সম্ভব নয়।’

নারায়ণগঞ্জে উৎপাদন ব্যাহত

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পঞ্চবটী বিসিক শিল্পনগরীর মেসার্স এমএস ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিংয়ের উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক বাবুল হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ নেই। কয়েক দিন ধরে তাঁদের প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে।

সদর উপজেলার ফতুল্লার কায়েমপুর এলাকার ফকির নিটওয়্যারে জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন চালু রাখতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানের মহাব্যবস্থাপক রাজীব আহমেদ।

গতকাল দুপুর থেকে রূপগঞ্জের রূপসী এলাকায় অবস্থিত দেশের অন্যতম বড় ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। সিটি গ্রুপের কারিগরি পরিচালক সৈয়দ রফিকুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘উৎপাদন চালু রাখতে ১২০ পিএসআই চাপ লাগে। কিন্তু দুপুরের পর থেকে গ্যাসের চাপ ২০–২৫–এ নেমে গেছে। সব কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।’

গাজীপুরে আবারও গ্যাস–সংকট

গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় জেলার অনেক কারখানায় উৎপাদন সীমিত রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে পোশাক কারখানার ডাইং ও গ্যাসনির্ভর বিভিন্ন সেকশনে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোনো কোনো কারখানায় ডাইং সেকশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

কোনাবাড়ী এলাকার একটি কারখানার ব্যবস্থাপক আবদুর রহমান বলেন, নিয়মিত ও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

গাজীপুর তিতাসের ব্যবস্থাপক সাইফুজ্জামান সানি বলেন, ‘গ্যাসের চাপ কিছুটা কমেছে। আশা করছি খুব দ্রুত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মহেশখালীতে আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির, অন্যটি দেশি কোম্পানি সামিটের। গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। টানা ২৫ দিনের তীব্র গ্যাস–সংকটের পর শনিবার সামিটের টার্মিনাল পুরোদমে এবং এক্সিলারেটের টার্মিনাল আংশিক চালু হলে সরবরাহ বাড়ে। তবে নতুন কার্গো না থাকায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে তিন দিন ধরে সরবরাহ কমছে। আগামীকাল ২০ আগস্ট একটি কার্গো আসার কথা রয়েছে, যা সামিটের টার্মিনালে যুক্ত হতে পারে। এক্সিলারেটের জন্য কার্গো ২৩-২৪ আগস্ট আসতে পারে বলে জানিয়েছে একটি সূত্র।