ভোরের আলো ফুটলেই হকির মাঠে দেখা যায় বাবুল মিয়াকে। বয়স পেরিয়েছে ৬৫। তবু অভ্যাসের জায়গায় সামান্যও ভাঁটা পড়েনি। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে যে টান তাঁকে প্রতিদিন মাঠে টেনে নেয়, সেই টানটাই তাঁর পরিচয়—হকি। কোনো একদিন হয়তো শরীর আর সায় দেবে না। প্রকৃতির নিয়মে সকাল হবে, খেলোয়াড়েরাও টার্ফে আসবেন; শুধু বাবুল মিয়াকে আর দেখা যাবে না পরিচিত সেই জায়গাটিতে। তার আগপর্যন্ত হকিই তাঁর ঠিকানা, হকিই জীবন।
১৯৭৫ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে বাবুল মিয়া প্রথম এসেছিলেন হকি ফেডারেশনে। তবে হকির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের শুরু আরও আগে। পুরান ঢাকার জিন্দাবাহারে কেটেছে শৈশব। আরমানিটোলা আর ধুপখোলা মাঠে ছিল নিয়মিত যাতায়াত। হাতে তুলে নিয়েছিলেন হকির স্টিকও—টুকরাক খেলেছেন, কখনো কখনো বড় খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্নও দেখেছেন। স্বপ্নটা পূরণ হয়নি।
বড় খেলোয়াড় হতে পারেননি তিনি। কিন্তু হকিরই এক জীবন্ত চরিত্র হয়ে উঠেছেন। ১৯৭৫ সালে ফেডারেশনে তাঁর শুরুটা ছিল পিয়ন হিসেবে। কাজ করতে করতে মাঠের মানুষগুলোর সঙ্গে গড়ে ওঠে সখ্য। ১৯৯০ থেকে প্রায় এক দশক জাতীয় দলের সহায়ক স্টাফ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। দলের ক্যাম্প, খেলোয়াড়দের অনুশীলন, ট্যুর, জয়–পরাজয়—অনেক গল্পের সাক্ষী তিনি।
২০০০ সালে বদলে যায় তাঁর কাজ ও পদবি। দায়িত্ব পান মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামের গ্রাউন্ডসম্যানের। এর পর থেকে স্টেডিয়াম, মাঠ, খেলোয়াড় আর হকির মানুষগুলোই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
একসময় যারা তাঁর সামনে ক্যাম্প করতেন, তাঁদের কেউ আজ কোচ, কেউ কর্মকর্তা। পাঁচ দশকে বদলে গেছে অসংখ্য মুখ, এসেছে নতুন প্রজন্ম। পরিবর্তন হয়নি শুধু বাবুল মিয়া—তিনি থাকেন হকির মাঠেই। তিনি যেন প্রজন্ম বদলের নীরব সাক্ষী। হকির পোস্টারবয় রাসেল মাহমুদ জিমিকে দেখেছেন ছোটবেলা থেকে; বাবার হাত ধরে মাঠে আসত ছোট্ট জিমি। দেশের হকির অন্যতম সেরা ড্র্যাগ ফ্লিকার মামুনুর রহমান চয়নকেও দেখেছেন কাছ থেকে—বিকেএসপির জীবন, জাতীয় দলে খেলা, এরপর অবসর—সবই জমা আছে বাবুল মিয়ার স্মৃতির ভান্ডারে।
কত খেলোয়াড় এসেছেন, কতজন চলে গেছেন—তবু বাবুল মিয়ার কাছে তাঁরা কেউ কখনোই শুধু খেলোয়াড় ছিলেন না। তাঁর কথায়, ‘আমার কাছে মনে হয়নি, এরা কেউ খেলোয়াড় বা দূরের কেউ। সবাইকে একটা পরিবারের মতোই মনে হয়।’
সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। হকির মানুষগুলোর কাছেও বাবুল মিয়া হয়ে যান আরও আপন। কারও কাছে তিনি চাচা, কারও বড় ভাই, কারও আবার মাঠের হিরো। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মামুনুর রহমান চয়ন বলেই দিয়েছেন, তিনি ছিলেন তাঁর অভিভাবকের মতো, ‘বাবুল ভাইকে আমরা শুধু মাঠকর্মী হিসেবে দেখি না। তিনি আমাদের পরিবারের একজন। ক্যারিয়ারের প্রথম দিন থেকে মাঠে এসে তাঁকে দেখেছি। কখনো বকা দিয়েছেন, কখনো সাহস দিয়েছেন, আবার প্রয়োজন হলে নিজের মানুষ হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমাদের কাছে তিনি সত্যিকারের হিরো।’
পুষ্কর খীসা মিমোর স্মৃতিতেও বাবুল মিয়া একই রকম আপন। ‘আমাদের প্রজন্মের কত গল্পের সাক্ষী বাবুল ভাই। অনুশীলনে, ক্যাম্পে এই একটা মানুষকেই সব সময় পাশে পাওয়া যায়।’
বিকেএসপির কোচ মওদুদুর রহমানের কথাতেও ধরা পড়ে বাবুল মিয়ার দীর্ঘ পথচলার ব্যাপ্তি। ‘আমরা যখন খেলোয়াড় ছিলাম, বাবুল ভাই তখনো মাঠে ছিলেন। আজ আমি কোচ, একইভাবে তিনি মাঠে আছেন। এত বছর ধরে একজন মানুষ কীভাবে একই ভালোবাসা নিয়ে কাজ করে যেতে পারেন, বাবুল ভাইকে না দেখলে সেটা বোঝা যাবে না।’
এই ভালোবাসার বিনিময়ে বাবুল মিয়া কী পেয়েছেন—বড় কোনো পুরস্কার নয়, পদ–পদবিও নয়। তবু এই হকির মাঠেই তিনি গড়ে তুলেছেন তাঁর সংসার। এই কাজ করেই পাঁচ সন্তানকে পড়াশোনা করিয়েছেন, তাঁদের জীবনের পথে দাঁড় করিয়েছেন। পাঁচ দশকের বেশি সময় যে জগতে কেটেছে, সেই জগতের উপার্জনেই চলছে পরিবার।
তবে রয়ে গেছে একটি না পারার বেদনাও। ‘ফ্যামিলিকে সরি, আমি কখনো তাদের সেভাবে সময় দিতে পারিনি।’ একদিকে হকির প্রতি অগাধ ভালোবাসা, অন্যদিকে পরিবারের জন্য সময় না দিতে পারার অপরাধবোধ—এই দুই টানেই বয়ে যায় তাঁর দিন। তবু শেষ পর্যন্ত হকিই তাঁর কাছে সব। ‘হকিই আমার সবকিছু। এখানে (হকি স্টেডিয়াম) না আসলে দিনটাই তো কাটে না।’
১৫ বছরের এক কিশোর; যে হকি ফেডারেশনে পিয়ন হিসেবে এসেছিল, আজ তিনি ৬৫ পেরোনো এক মানুষ। মাঝখানে বদলে গেছে বাংলাদেশ। বদলেছে হকির প্রজন্ম, মাঠ, খেলোয়াড়, কোচ, কর্মকর্তা। বদলেছে তাঁর নিজের জীবনও। শুধু বদলায়নি হকির প্রতি টানটা। তাই বয়স বাড়লেও সকাল হলেই তিনি মাঠে আসেন। কারণ, এই মাঠের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক চাকরির নয়, জীবনের।
তবে জীবন তো চিরকাল থাকে না। মাঝেমধ্যে সেই শেষ অধ্যায়ের কথাও ভাবেন বাবুল মিয়া। ‘কোথায় লাইফটা শেষ করব, অনেক সময় এই চিন্তাটাও হয়।’
কত দিন মাঠে আসতে পারবেন, সেটা জানেন না। কিন্তু যত দিন পারবেন, হকির সঙ্গেই থাকতে চান। ‘আর কত দিন বাঁচব, জানি না। বাকি দিনগুলো হকির সঙ্গেই কাটাতে চাই। এটা আমার রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে।’
কোনো একদিন বাবুল মিয়া আর হকির মাঠে আসবেন না। মাঠ থাকবে। নীল টার্ফ থাকবে। খেলোয়াড় থাকবে। বাঁশি বাজবে। ম্যাচ হবে। গ্যালারিতে দর্শক থাকবে। শুধু থাকবেন না সেই পরিচিত মানুষটি। সেদিন হয়তো মাঠের এক কোণে রাখা পুরোনো স্টিক কিংবা কোনো খেলোয়াড়ের স্মৃতিতে ফিরে আসবে তাঁর নাম। মনে হবে, এই মাঠে একজন মানুষ ছিলেন—বড় খেলোয়াড় হতে পারেননি। কিন্তু পাঁচ দশকের বেশি সময় হকির সঙ্গে থেকে হকিরই একজন হয়েছিলেন। তাঁর নাম—বাবুল মিয়া। তাঁর গল্পটা, হকির সঙ্গে একজীবন।