একসময় চীন দারিদ্র্য ও আফিমের নেশায় জর্জর ছিল। দীর্ঘদিন বিদেশি শক্তির আধিপত্য টের পাওয়া যেত, আর দুর্দশারও শেষ ছিল না। তখন সাংহাই আজকের মতো ঝাঁ-চকচকে বৈশ্বিক বাণিজ্যনগরীও ছিল না।
‘জার্নি টু আ ওয়ার’ গ্রন্থে ডব্লিউ এইচ অডেন ও ক্রিস্টোফার ইশারউডের বর্ণনায় এসেছে—নদী থেকে তাকালে উঁচু ভবনগুলো দেখে মনে হতো, সাংহাই বড় শহর। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ১৯৩৯ সালে সাংহাই শহরের চিত্র এমনই ছিল। আজ সেই দিন আর নেই। চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বিশ্বের ১৫১টি দেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। সাংহাইও দেশের বাইরে বিশ্বের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যনগরী।
১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার সময় দেশটি মূলত কৃষিনির্ভর ও দরিদ্র ছিল। এরপর তারা শিল্পায়নে গুরুত্ব দেয় এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের ধাঁচে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক মডেল অনুসরণ করে।
পরিস্থিতি বদলায় আরও প্রায় ৩০ বছর পর। ১৯৭৮ সালে দেং জিয়াওপিংয়ের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বাজারমুখী সংস্কার, কৃষিতে উৎপাদনব্যবস্থার পরিবর্তন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন—সব মিলিয়ে চীনের অর্থনীতির গতিপথ পাল্টে যায়। এর আগে মাওয়ের আমলে শিল্পভিত্তি, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও অবকাঠামোর যে ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী সংস্কার তার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়ায়। ফলে আজ চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।
বৈশ্বিক বাস্তবতা হলো—বিশ্বের বহু দেশের শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থা চীনের কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য, যন্ত্রপাতি ও উপকরণের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। চীন থেকে প্রয়োজনীয় উপকরণ না পেলে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে সব দেশ একই মাত্রায় নির্ভরশীল নয়। কিছু দেশ চীন থেকে প্রধানত ভোগ্যপণ্য আমদানি করে, আবার কিছু দেশের শিল্প উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় মধ্যবর্তী পণ্য ও যন্ত্রপাতির বড় অংশ আসে চীন থেকে।
গত দুই দশকে চীনের বাণিজ্যিক প্রভাব কতটা বেড়েছে, তা বোঝা যায় বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক অংশীদারের তালিকা দেখলে। বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে চীনই উঠে এসেছে। একসময় যেসব দেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার ছিল যুক্তরাষ্ট্র, অনেক ক্ষেত্রে সেই অবস্থানেও বদল এসেছে।
২০২৫ সালের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র তুলে ধরেছে ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্ট। সংস্থাটি তথ্য নিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ডিরেকশন অব ট্রেড স্ট্যাটিস্টিকস থেকে। কোন দেশের সঙ্গে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বেশি—এ তুলনা করে পরিসংখ্যান সাজানো হয়েছে। এতে বিশ্ববাণিজ্যে চীনের প্রভাব কোথায় কতটা বিস্তৃত হয়েছে এবং কোন কোন দেশে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান শক্তিশালী, সেটি দেখতেও সুবিধা হয়।
চীনের বাণিজ্যিক উত্থানের বড় মোড় আসে ২০০১ সালে। সে বছর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) যোগ দেয় চীন। এরপর দ্রুত শিল্পায়ন, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হয় দেশটি। এর মধ্য দিয়ে চীন বিশ্বের অন্যতম প্রধান উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয়। চীনের পণ্য ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তে। তুলনামূলক সস্তা দামে পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা তাদের উন্নয়নশীল দেশের উঠতি মধ্যবিত্তের চাহিদা পূরণে সামনে নিয়ে আসে।
আইফোনের উদাহরণও একই ইঙ্গিত দেয়। চীনে ব্যাপক উৎপাদন, দক্ষ শ্রম, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বড় ধরনের নেটওয়ার্ক এবং উন্নত অবকাঠামোর কারণে আইফোনের মতো প্রযুক্তিপণ্য তুলনামূলক কম খরচে তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। ফলে এই ধরনের পণ্য শুধু উন্নত দেশের ধনীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের মধ্যবিত্তের হাতেও এসেছে।
এর ফলও ধরা পড়ছে পরিসংখ্যানে। ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টের হিসাব অনুযায়ী, ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের সঙ্গে বেশি বাণিজ্য করত মাত্র ৩৩টি দেশ। দুই দশকের কিছু বেশি সময়ে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫১–তে।
গত দুই দশকে শুধু চীনের রপ্তানি বাড়েনি; বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে দেশটির সম্পর্কও গভীর হয়েছে। অনেক দেশের জন্য চীন এখন কেবল পণ্য কেনা-বেচার দেশ নয়, তাদের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। এভাবেই বৈশ্বিক বাণিজ্যের মানচিত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ধীরে ধীরে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
চীনের ওপর আমদানি-নির্ভরতার ক্ষেত্রে কম্বোডিয়া এগিয়ে রয়েছে। দেশটির মোট পণ্য আমদানির ৪৬ দশমিক ৮ শতাংশ আসে চীন থেকে। অর্থাৎ কম্বোডিয়া বিদেশ থেকে ১০০ ডলারের পণ্য আমদানি করলে প্রায় ৪৭ ডলারের পণ্যই চীন থেকে আসে। এরপর রয়েছে মিয়ানমার—দেশটির মোট আমদানির ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ আসে চীন থেকে। পেরুর ক্ষেত্রে এ হার ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
এশিয়ার বাইরে চীনের ওপর উল্লেখযোগ্য নির্ভরশীলতার মধ্যে আছে অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, চিলি ও রাশিয়া। অস্ট্রেলিয়ার মোট পণ্য আমদানির ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ, ব্রাজিল ও চিলির ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রাশিয়ার ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ আসে চীন থেকে। শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে এ হার ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ, জাপানের ২২ দশমিক ৫ শতাংশ ও দক্ষিণ আফ্রিকার ২১ দশমিক ৫ শতাংশ।
অন্যদিকে চীনের সঙ্গে বিরোধ থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের মোট পণ্য আমদানির ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ আসে চীন থেকে। কানাডার ক্ষেত্রে এ হার ১১ দশমিক ৬ শতাংশ। ইউরোপের বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে জার্মানির মোট আমদানির ১২ দশমিক ৩ শতাংশ, যুক্তরাজ্যের ১২ দশমিক ২ শতাংশ, ইতালির ৯ দশমিক ১ শতাংশ ও ফ্রান্সের ৮ দশমিক ৮ শতাংশ আসে চীন থেকে।
চীন শুধু বিশ্বের অন্যতম বড় রপ্তানিকারক নয়, অনেক দেশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারীও। বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার কিছু দেশের আমদানির ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা বেশি। এসব দেশের উৎপাদনশিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক পণ্য ও ভোগ্যপণ্যের বড় অংশ আসে চীন থেকে। ফলে চীনের উৎপাদন বা রপ্তানিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে এসব দেশের সরবরাহব্যবস্থা ও স্থানীয় শিল্পে তুলনামূলকভাবে বেশি প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্বজুড়ে উৎপাদনব্যবস্থা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় একটি পণ্য তৈরির প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সব জায়গায় একই দেশে তৈরি হয় না। এই সরবরাহব্যবস্থায় এখন চীনের আধিপত্য এত গভীর যে বহু ক্ষেত্রে তাকে এড়িয়ে চলাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
২০২০ সালে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় চীন কঠোর লকডাউনে যায়। সে সময় প্রভাব দ্রুত বিশ্বের নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। প্রয়োজনীয় জিনিস—মাস্ক—যুক্তরাষ্ট্রও আমদানি করত চীন থেকে। পাশাপাশি চীন থেকে যেসব যন্ত্রাংশ, কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেত, সেগুলোর সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হয়। এ অভিজ্ঞতা দেখায়, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা চীনের ওপর কতটা নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারও চীন। ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে বাংলাদেশি বাজারে চীনা পণ্যের দাপট শুরু হয়েছিল এবং তা এখনো বজায় আছে—অর্থাৎ পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের প্রথম পছন্দের দেশ চীন।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীন থেকে পণ্য আমদানি করেছে ২ হাজার ৬১ কোটি ডলারের। সে বছর বাংলাদেশ মোট পণ্য আমদানি করেছে ৬ হাজার ৭৪৪ কোটি ডলারের। অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পণ্য আমদানির প্রায় ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ এসেছে চীন থেকে। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা ছিল ২৭ শতাংশ—অর্থাৎ চীনের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে।
চীন থেকে বাংলাদেশ শিল্পকারখানার যন্ত্র, কেমিক্যাল, বস্ত্র খাতের কাঁচামাল, ইলেকট্রনিক পণ্য ও আসবাব আমদানি করে। আবার পোশাক তৈরির বেশির ভাগ কাঁচামালও আসে চীন থেকে। এসব উপকরণ দিয়ে তৈরি পণ্য বাংলাদেশ রপ্তানিও করে।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ চলায় দুই দেশের সম্পর্কের বৈপরীত্যও স্পষ্ট। রাজনৈতিকভাবে দূরত্ব যত বাড়ছে, শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থার কিছু ক্ষেত্রে পারস্পরিক নির্ভরতা তত সহজে ভাঙছে না। স্মার্টফোন, ব্যাটারি, সেমিকন্ডাক্টর, উড়োজাহাজ প্রযুক্তি ও জ্বালানিবাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই নির্ভরশীলতা দৃশ্যমান।
২০২৪ সালের বাণিজ্য তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, স্মার্টফোন ও ফোনের সরঞ্জাম থেকে শুরু করে খেলনা ও ভিডিও গেমের কনসোল—বিভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অনেকাংশে চীনের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে উড়োজাহাজ প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর ও জ্বালানি রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল চীন। জাতিসংঘের বাণিজ্যবিষয়ক তথ্যভান্ডার ইউএন কমট্রেডের সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে এই চিত্র পাওয়া গেছে।
চীন বিশ্বে নিজেদের অবস্থানকে কেবল ‘বিশ্বের কারখানা’ হিসেবে না রেখে উচ্চ প্রযুক্তির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলারও চেষ্টা করছে। গত কয়েক বছরে বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি, তা উল্লেখযোগ্য। এখন আর টেসলা নয়—বৈদ্যুতিক গাড়ির জগতে সবচেয়ে অগ্রণী নাম হিসেবে উঠে এসেছে চীনের বিওয়াইডি। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিওয়াইডির কারখানা গড়ে উঠছে। সেমিকন্ডাক্টর থেকে শুরু করে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্য তৈরিতে যে বিরল মৃত্তিকার প্রয়োজন হয়, তার সিংহভাগও চীনের হাতে।
বর্তমানে বিরল খনিজ খননের ৭০ শতাংশ, প্রক্রিয়াজাতকরণের ৯০ শতাংশ এবং চুম্বক তৈরির ৯৩ শতাংশই চীনের নিয়ন্ত্রণে। তুলনামূলকভাবে কম দামে পণ্য দিয়ে তারা নতুন প্রতিযোগীদের বাজারে প্রবেশকে নিরুৎসাহিত করেছে—যার ফলে পশ্চিমাদের বিকল্প সরবরাহ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের সংবাদে বলা হয়েছে, চীনের বাণিজ্যের ধরনে পরিবর্তন আসছে। সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের পর এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প সরঞ্জামের দিকে ঝুঁকছে তারা। নতুন প্রজন্মের এসব কোম্পানি প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই বৈশ্বিক বাজার লক্ষ্য করে এগোচ্ছে—গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকেরা এমনটাই বলছেন। মঙ্গলবার প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বিনিয়োগ ব্যাংকটি জানিয়েছে, ‘চীন এখন গো গ্লোবাল ৩.০ যুগে প্রবেশ করেছে।’
সব মিলিয়ে, চীনের উত্থান কেবল এক দেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প নয়; একই সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামোর পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দেয়। শিল্পায়ন, বাণিজ্য ও প্রযুক্তির সক্ষমতায় চীন এখন বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার কেন্দ্রস্থলে। ফলে দেশটির ওপর বিশ্বের নির্ভরতা বেড়েছে, পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও তীব্র হয়েছে। আগামী দিনের বিশ্ব অর্থনীতি অনেকাংশেই নির্ভর করবে—এই সম্পর্কের গতিপথের ওপর।