চট্টগ্রামে আন্ডারওয়ার্ল্ড তথা অপরাধজগতের যে ভয়াবহ উত্থান ঘটেছে, তা গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুক্তকণ্ঠের ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অপরাধী চক্রের সীমাহীন দৌরাত্ম্যের কারণে ব্যবসায়ী, ভবনমালিক এবং সাধারণ মানুষ এখন চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এই আতঙ্ক কেবল বন্দরনগরীর ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং রাউজানসহ চট্টগ্রামের আশপাশের উপজেলাগুলোর মানুষও দেশি-বিদেশি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত একদল দুর্ধর্ষ অপরাধী চক্রের কাছে কার্যত জিম্মি। এই পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ও প্রশাসনের চরম ব্যর্থতারই বহিঃপ্রকাশ।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার উন্নতিকে অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখলেও, গত ছয় মাসে চট্টগ্রামের অপরাধী চক্রের সন্ত্রাসী কার্যক্রম আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। পুলিশি অভিযানে কিছু আলোচিত সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হলেও তা সাময়িক স্বস্তি দিলেও জননিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদী কোনো প্রভাব ফেলছে না। বিশেষ করে রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ার পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক; একের পর এক খুনের ঘটনায় এই দুই উপজেলা রক্তাক্ত জনপদে পরিণত হয়েছে।
চট্টগ্রামের অপরাধজগতের সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিক হলো এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। প্রযুক্তির সহায়তায় সুদূর বিদেশ কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামের গহিন অরণ্যে আস্তানা গেড়ে পরিচালিত হচ্ছে এই গ্যাং রাজত্ব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকি প্রদান এবং অস্ত্র উঁচিয়ে মহড়া দেওয়ার মাধ্যমে পুরো চট্টগ্রামে এক মনস্তাত্ত্বিক ভীতি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কগুলো মূলত তিন স্তরে বিভক্ত—শীর্ষে থাকা পলাতক গডফাদার বা নির্দেশদাতা, স্থানীয় সমন্বয়ক এবং মাঠপর্যায়ের শুটার। অর্থ, মোটরসাইকেল ও মাদকের প্রলোভন দেখিয়ে ছিন্নমূল তরুণ ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের দলে টানা হচ্ছে, এমনকি আনুগত্য নিশ্চিত করতে তাদের দিয়ে ধর্মীয় শপথও করানো হচ্ছে। মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে আসা অবৈধ অস্ত্র এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে হাতবদল হওয়া আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের অবাধ ব্যবহার এই চক্রগুলোকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।
এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মূলে কেবল ব্যক্তিগত শত্রুতা নয়, বরং বিপুল অবৈধ অর্থের এক ‘ইকোসিস্টেম’ কাজ করছে। পরিবহন খাত, ফুটপাত, ঝুটব্যবসা, নির্মাণাধীন ভবন, কোটি কোটি টাকার ব্যক্তিমালিকানাধীন প্লট এবং কর্ণফুলী নদীর ঐতিহ্যবাহী ঘাট ও বালুমহাল—সবকিছুতেই এখন নতুন নতুন দখলদার ও চাঁদাবাজদের নজর। সরকারদলীয় প্রভাবে এই অপরাধী চক্রগুলো সীমাহীন আধিপত্য বিস্তার করেছে। রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কিংবা ‘ছায়া’ হিসেবে রেখে এই অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম শহর ও পার্শ্ববর্তী উপজেলাগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরায় অপরাধীদের সন্ত্রাসী কার্যক্রম ধরা পড়ছে। তারা নির্বিঘ্নে গুলি চালিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে এবং সেসব দৃশ্য মুহূর্তেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হচ্ছে। তা সত্ত্বেও তাদের গ্রেপ্তার করতে না পারায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা ও সদিচ্ছা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। ভুক্তভোগীরা ভয়ে মামলা করতে পারছেন না এবং পুলিশের কিছু অসাধু সদস্য অপরাধীদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসওয়ারা নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, যা বিচারব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধকে তলানিতে ঠেকিয়েছে। অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শুটাররা গ্রেপ্তার না হওয়া, কিংবা গ্রেপ্তার হলেও দ্রুত জামিনে বেরিয়ে পুনরায় অপরাধে জড়ানোর প্রবণতা প্রমাণ করে যে, কেবল মৌখিক আশ্বাস বা সাময়িক বহিষ্কার দিয়ে এই রাজত্ব বন্ধ করা সম্ভব নয়।
প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ না হলে চট্টগ্রামের এই অপরাধজগতের লাগাম টানা অসম্ভব। রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে সরকারকেই এখন কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় বন্দরনগরীর অর্থনীতি ও নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা আরও বড় হুমকির মুখে পড়বে, যার প্রভাব অনিবার্যভাবেই পড়বে গোটা দেশে।