ষাটের দশক এ দেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে উজ্জ্বলতম গৌরবকাল। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেই অগ্নিগর্ভেই রাজনীতির পাঠ নিয়েছেন। লড়েছেন। বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে লিখেছেন সৌমিত জয়দ্বীপ
.রাজনীতি থেকে সত্যই আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর! ‘সত্য যে কঠিন,/ কঠিনেরে ভালোবাসিলাম/ সে কখনো করে না বঞ্চনা।’ বিদায়বেলায় তাঁর কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ লেখা কাব্যগ্রন্থের উল্লিখিত বিখ্যাত পঙ্ক্তিগুলো মনে পড়ছিল?
রাজনীতির বাইরে শিল্প-সাহিত্য, সমাজ-সংস্কৃতি নিয়ে যখনই আলোচনা করেন, বারবার তাঁর কণ্ঠ রবীন্দ্রনাথের প্রতি নিবেদন করে এক অনবদ্য নৈবেদ্য। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে লিখতে গিয়ে তাই তাঁর প্রিয় সাহিত্যিকের শরণাপন্ন হতে হলো। এ মুহূর্তে এই পঙ্ক্তিগুলোই আসলে তাঁর জীবনের সারবত্তা।
রাজনীতিক হিসেবে স্বচ্ছ ভাবমূর্তি, আত্মমর্যাদা, ব্যক্তিত্ব, সততা, মার্জিত রুচিবোধ এবং নেতৃত্বের সহজাত গুণে দলমত–নির্বিশেষে শ্রদ্ধেয় ও বরেণ্য হওয়ার এক বিরল সম্মান মির্জা ফখরুল অর্জন করেছেন। তাঁর মতো জননন্দিত জাতীয় নেতার রাষ্ট্রপতির পদ অলংকৃত করার মাহাত্ম্য তাই অপরিসীম।
.গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে পদচ্যুত করার বহু চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী হঠকারিতার সময়ে সাংবিধানিক রাজনীতির ধারাবাহিকতা রক্ষায় বিএনপি ছিল প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এসব ব্যাপারে তখন মির্জা ফখরুলের বিচক্ষণতাবোধ, দূরদর্শিতা এবং সংবিধান, রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে বোঝার অমিত দক্ষতা বহু দক্ষিণপন্থী বিপদ থেকে বাংলাদেশকে বাঁচিয়েছে।
নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংসদীয় আসন জিতেও বিএনপি রাষ্ট্রপতি পদ নিয়ে তাড়াহুড়ো করেনি। রাষ্ট্রপতিকে সম্মানজনক বিদায়ের পথ করে দিয়েছে। বিরোধীদের ঘোর আপত্তি সত্ত্বেও অভিশংসনের পথে যায়নি। বিএনপির এই ‘ধীরে চলো’ নীতি রাজনৈতিক পরিপক্বতার দারুণ দৃষ্টান্ত।
এ জন্যই রাষ্ট্রপতি পদে অরাজনৈতিক ও দলনিরপেক্ষ কাউকে বিবেচনা না করা বিএনপির আরেকটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে যে সময় বাংলাদেশ অতিক্রম করছে, তাতে রাষ্ট্রপতি পদে একজন প্রজ্ঞাবান বর্ষীয়ান রাজনীতিকের প্রয়োজন ছিল, যিনি নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে বিচক্ষণ ও সর্বজনগ্রাহ্য।
.বিএনপি নানা রাজনৈতিক সমীকরণও মিলিয়েছে। প্রথমত, ২০৩১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের পাঁচ বছর পূর্ণ হবে এবং ২০৩১ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত থাকবে নতুন রাষ্ট্রপতির মেয়াদ। দ্বিতীয়ত, সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য অত্যাসন্ন। তৃতীয়ত, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে এসেছে। এসব মিলিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি হয়ে উঠবেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে পরীক্ষিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অপরিহার্যতা বর্তমান বাংলাদেশে তুলনাতীত।
ষাটের দশকে ছাত্রনেতা থেকে সত্তর দশকে অর্থনীতির শিক্ষক, উপপ্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব থেকে আবার শিক্ষকতা, তারপর পৌর চেয়ারম্যান থেকে সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী এবং অতঃপর পার্টির মহাসচিব ও জাতীয় রাজনীতিক হয়ে এলজিআরডি মন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রপ্রধান—অবহেলিত সর্ব-উত্তরের একটি জনপদ থেকে মির্জা ফখরুলের এই উত্থান সত্যই রূপকথার মতো।
.মির্জা ফখরুল ইসলাম জীবনভর ঠাকুরগাঁওয়ের মাটিতেই রাজনীতি করেছেন। যেমনটা করেছিলেন তাঁর পিতা মির্জা রুহুল আমিন। তাঁদের আদিভূমি পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুরে। বিখ্যাত মির্জা বংশের সূত্রেই এলাকার এই নামকরণ। এখান থেকেই জাতীয় রাজনীতির মুখ হয়েছিলেন সাবেক স্পিকার ও মন্ত্রী এবং মির্জা ফখরুলের চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ।
এ কারণে মির্জা ফখরুল পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও দুই হিমালয় দুহিতারই ভূমিপুত্র। নির্বাচনের পর এই দুই জেলার পথ-প্রান্তর কিংবা চায়ের আড্ডায় কান পাতলেই শোনা যেত আমজনতার আকাঙ্ক্ষা: ‘হামার (আমাদের) স্যার প্রেসিডেন্ট হবে। হামরা প্রেসিডেন্টের এলাকার নোক হোমো।’
শিক্ষক হিসেবে তিনি আজও এতটাই লোকপ্রিয় যে শিক্ষকতা ছেড়ে রাজনীতিতে যোগদানের ৪০ বছর পরও প্রজন্মান্তরে সবার কাছে তিনি ‘স্যার’। এটা ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে আসেনি, ভালোবাসা থেকেই এসেছে।
ঠাকুরগাঁওয়ে সাধারণত ছোটরা বড়দের ‘তুমি’ সম্বোধন করে, বড়রা ছোটদের ‘তুই’ বলেন। মুরব্বিরাও প্রথম দর্শন থেকেই ‘তুই’ বলতে অভ্যস্ত—এটাই এখানকার আন্তরিকতা ও ভালোবাসার সংস্কৃতি। মির্জা ফখরুলও এলাকায় বক্তৃতাকালে এই সাংস্কৃতিক আন্তরিকতার ছাপ রাখেন। স্থানীয় ভাষায় যখন ‘তোমরা ভয় পাবেন নাই, মুই তো আছু’ বলেন, তখন একজন জাতীয় নেতার চেয়ে ভূমিপুত্রের মাটিঘেঁষা আন্তরিকতাটা বেশি ফুটে ওঠে।
.রাষ্ট্রপতি কি শুধুই আলংকারিক পদ.রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য.একজন রাজনীতিক প্রথমবার সংসদ সদস্য হওয়ার পর টানা ২৫ বছর রাজনৈতিক কারণে এলাকার বাইরেই জীবনটা কাটিয়ে দিলেন। কৃষ্ণ থেকে শুভ্র হয়ে গেল তাঁর চুল-গোঁফ। অথচ তাঁর কাছে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সামাজিক অনুষ্ঠান ঘিরে এলাকাবাসীর আবদারের অন্ত নেই। বিস্ময়করভাবে শেষতক তা রাষ্ট্রপতি পদে গিয়ে ঠেকেছে!
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে জেতার পর উল্লসিত তরুণেরা তাঁকে অনেক বড় রাষ্ট্রীয় পদে দেখার অভিপ্রায়ে যখন তাঁর ঠাকুরগাঁওয়ের কালীবাড়ির বাড়ির সামনে পটকা ফোটাচ্ছিলেন, তখন তিনি তীব্র শীতের রাতে বেরিয়ে এসে বলেছিলেন, ‘তোরা বড় হবি কবে? সব ক্লোজ করে বাসায় যা। মানুষকে ঘুমাতে দে।’
তাঁর কাছে ছুটে গিয়ে লোকজন ‘স্যার, আপনাকে রাষ্ট্রপতি পদে দেখতে চাই’ আওয়াজ তুলেছেন। তিনি নাকচ করে দিয়ে ঘরোয়া বৈঠকেই চিরহরিৎ স্নেহার্দ্র সুরে শিক্ষকসুলভ প্রত্যুত্তর করেছেন, ‘তোরা বুঝিস না, রাষ্ট্রপতি হলে তো অনেক অসমাপ্ত কাজ করতে পারব না।’ তখনো সারা দেশে গুঞ্জন, তিনি রাষ্ট্রপতি হতে পারেন। আর এলাকাবাসী অফলাইন-অনলাইনে হাইপ তুলে ফেলেছেন—আমাদের স্যারই রাষ্ট্রপতি!
.ঠাকুরগাঁওয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সংস্কৃতিচর্চার প্রসারে ষাটের দশকে উচ্চশিক্ষা নেওয়া প্রজন্মটির অবদান এখনো লোকে স্মরণ করে। ২০০১-০৬ পর্যন্ত যখন দুটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম, তখন অতিথি হয়ে এলাকার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আসতেন। বক্তৃতাকালে নিজেদের সময়ের গল্প বলতেন। কত যে রেফারেন্স দিতেন, তার ইয়ত্তা নেই! মনে পড়ে, ঠাকুরগাঁও জেলা ক্রিকেট লিগের সমাপনী আয়োজনে একবার তাঁর হাত থেকে পুরস্কার নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। যথারীতি সেদিনও খেলাধুলা নিয়ে গল্পের ঝাঁপি খুলে দিয়েছিলেন।
আমার কাকুরা ঠাকুরগাঁও কলেজে পড়তেন। তাঁদের স্মৃতিতেও ‘আলমগীর স্যার’ মানেই ক্লাসের বাইরে মঞ্চে নাটকের অভিনয়, সংলাপ প্রক্ষেপণ ও কবিতা আবৃত্তি। স্কুলজীবনে ফণীন্দ্রভূষণ পালিতের কাছে তাঁর নাটকের হাতেখড়ি। পরে অভিনয়ের পাশাপাশি দিতেন নাট্যনির্দেশনাও। শুনেছি, তাঁর অভিনীত অন্ধকারের নিচে সূর্য, ফিঙ্গার প্রিন্ট, চারিদিকে যুদ্ধ, সিরাজউদ্দৌলা প্রভৃতি নাটক ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল ঠাকুরগাঁওয়ে।
সিরাজউদ্দৌলায় আনোয়ার হোসেনের অভিনয় টেলিভিশনের বদৌলতে সমগ্র দেশ দেখেছে। কিন্তু ঠাকুরগাঁওয়ের মঞ্চে আনোয়ার অভিনীত সিরাজের বিপরীতে রবার্ট ক্লাইভের যে অভিনয় মির্জা ফখরুল করেছিলেন, সেটার কিংবদন্তিকথা আজও প্রত্যক্ষদর্শীদের মুখে শোনা যায়। চিত্রনায়ক আবদুর রহমান ছিলেন তাঁর মামাতো ভাই, দুজনে অভিনয়ও করেছেন এক মঞ্চে।
.ষাটের দশক এ দেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে উজ্জ্বলতম গৌরবকাল। মির্জা ফখরুল সেই অগ্নিগর্ভেই রাজনীতির পাঠ নিয়েছেন। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানকালে জেলে গেছেন। তখন তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (ইপসু, ভাসানীপন্থী মেনন গ্রুপ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি। সে সময় একটা আটপৌরে মফস্সল থেকে এত বড় সংগঠনের বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি হওয়া ছিল বিশাল ঘটনা।
স্বাধীনতা ও স্বৈরাচার প্রশ্নে ষাটের দশকের ছাত্রনেতারা ছিলেন সুদৃঢ়ভাবে আপসহীন। তাঁরা ছিলেন জাতীয় বীর। ফলে বিভিন্ন সংগঠনের ছাত্রনেতারা প্রায় সবাই রণাঙ্গন থেকে ফিরে জাতীয় রাজনীতিতে অভিষিক্ত হয়েছিলেন বিপুল গৌরবে। মির্জা ফখরুল ছিলেন ব্যতিক্রম। গেলেন শিক্ষকতায়, পাশাপাশি শিল্পচর্চায়। পারিবারিক সূত্রে রাজনীতি ছিল তাঁর রক্তে। স্বাধীনতার প্রায় ১৪ বছর পর সরকারি চাকরির নিশ্চিত সুবিধাদির মায়া কাটিয়ে প্রত্যাবর্তন করলেন রাজনীতির কণ্টকাকীর্ণ ও অনিশ্চিত জীবনে।
.প্রেস সচিব কাফি খানের স্মৃতিচারণা: কেমন ছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়া.শহীদ রাষ্ট্রপতি-জেনারেল জিয়াকে যেমন দেখেছি.এলাকায় জনপরিচিতি তো ছিল প্রভূত। সাবেক ছাত্রনেতা হিসেবে যেমন, পিতার সূত্রেও তেমন। যদিও পিতার সঙ্গে রাজনৈতিক আদর্শের ভিন্নতা ছিল, তবু পিতার তরফে বাধা না পাওয়ার বিষয়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। পিতৃপ্রভাব থাকলে বামপন্থী রাজনীতিতে জড়াতে পারতেন না। যেমন পারতেন না রাশেদ খান মেনন, বদরুদ্দীন উমর প্রমুখ। মির্জা ফখরুল প্রসঙ্গে এসব কথা অবশ্য কমই উচ্চারিত হয়েছে। এটা রাজনৈতিক বয়ানেরই খেলা। কিন্তু তেভাগা আন্দোলনের উর্বরক্ষেত্র বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল রাজনীতির সংস্কৃতিটা জানা থাকলে বহু প্রথাগত বয়ান আদতে বদলে যেতে বাধ্য।
মির্জা ফখরুল ইসলাম সারা জীবন যে অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের কথা বলে গেলেন, সৃষ্টিশীল ও মননশীল ও প্রগতিশীল চর্চায় আস্থা রাখলেন, এলাকায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ সবার আস্থার প্রতীক হয়ে উঠলেন এবং সর্বোপরি লোকপ্রিয় হলেন, তার পাটাতনটা আসলে অতিশক্তিশালী ছিল। ১৯৮৬ সালে রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের পর ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাটি তাঁর ওই লোকপ্রিয় ক্যারিশমারই এক অনন্য উদাহরণ।
.না, মির্জা ফখরুলের রাজনীতি সরল পথে এগোয়নি। উত্থান-পতন ছিলই। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের শেষাঙ্কে ‘বড়দের’ রাজনীতিতে অভিষিক্ত হয়ে যোগ দিলেন বিএনপিতে। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কাছে পরাজয়। কিন্তু ২০০১ সালে শুধু জয়ই পেলেন না, প্রতিমন্ত্রিত্বও পেলেন। ২০০৮ সালে জাতীয়ভাবে বিএনপির ভূমিধস পরাজয় ঘটলেও তিনি খুব অল্প ব্যবধানে হেরেছিলেন।
এরপর বাংলাদেশে যে গভীর গণতান্ত্রিক সংকট সৃষ্টি হলো, পুরোটাই একদম সম্মুখসারির নেতা হিসেবে মোকাবিলা করেছেন মির্জা ফখরুল। ২০১১ সালে পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব থেকে ২০১৬ সালে পেলেন পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব। খালেদা জিয়া কারাগারে, তারেক রহমান প্রবাসে—বিএনপির মতো বড় দলকে কার্যত ঐক্যবদ্ধ করে রেখেছিলেন মির্জা ফখরুলই। অথচ তিনি নিজেও ১১ বার জেলে গিয়েছেন! ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান ও এর পরবর্তী দুই বছরে রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণেও তাঁর অগ্রণী ভূমিকা জাতীয়ভাবে অনস্বীকার্য।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পথপরিক্রমা যদি আওয়ামী লীগ বিগত দেড় দশকে জটিল না করে তুলত, তাহলে মির্জা ফখরুল হতেন একজন নিয়মিত পার্লামেন্টারিয়ান। ২০১৮ সালে নির্বাচনে জিতেও শপথ নেননি, কারচুপির প্রতিবাদে। ফলে বিএনপির আগের পূর্ণ মেয়াদ আর এবারের ছয় মাস—পার্লামেন্টেরিয়ান হিসেবে মাত্র সাড়ে পাঁচ বছরের স্বল্পায়ু-জীবন তাঁর। গণতন্ত্রের অভাবে এমন একজন পরিশীলিত ও প্রজ্ঞাবান রাজনীতিক সংসদে কথা বলতে পারলেন না, ব্যাপারটা জাতির জন্য সত্যই দুঃখজনক।
পৌনঃপুনিক বাধা ও বহু পরাভব সত্ত্বেও সংসদীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতি তিনি কখনো অনাস্থা ও অশ্রদ্ধা রাখেননি। লড়েছেন। কারাবরণ করেছেন। সংগ্রামের এই ধারাবাহিকতাই তাঁকে নিয়ে গেল রাষ্ট্রের শীর্ষবিন্দুতে। জীবনের পাণ্ডুলিপি কারও কারও সত্যই এমন হয়!
.রাষ্ট্রপতি ও রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে যা বলেছিলেন কমিশনের দুই সদস্য.রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য ছাড়া কী করে সংস্কার হয়.মুক্তিযুদ্ধকালীন ভারতের কথা। সমাজতান্ত্রিক নেতা কর্পূরী ঠাকুর তখন বিহারের ডাকসাইটে মুখ্যমন্ত্রী। বামপন্থী মুক্তিযোদ্ধাদের যুবশিবির স্থাপনে তিনি সাহায্য করেছিলেন। একদিন তরুণ আলমগীর দেখলেন, একজন মুখ্যমন্ত্রী রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছেন, সঙ্গে মাত্র একজন গানম্যান। বিস্মিত হয়েছিলেন। পরে বলেছেন, কত বড় রাজনীতিক কিন্তু প্রটোকল বলতে কিছুই নেই। অথচ আমাদের একেকজন মন্ত্রীর কত প্রটোকল।
সারল্য, সততা ও অকপটতা তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রেরই গুণ। আজকাল যা বিরল। নির্বাচনের আগে বলেছিলেন, এটাই তাঁর শেষ নির্বাচন। সত্যই শেষ হলো! মাঠের রাজনীতি থেকে তাঁর এ প্রস্থান মানে একটি রাজনৈতিক স্কুলের মহিরুহ শিক্ষকেরই প্রস্থান। মানুষের সঙ্গে থেকেছেন বরাবরই। জনগণের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়ল, এ শূন্যতা অপরিসীম। এখন রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে ভারাক্রান্ত হবেন। কিন্তু দেশের বৃহত্তর স্বার্থেই তাঁর ‘আমাদের রাষ্ট্রপতি’ হওয়া জরুরি ছিল। সত্য যে আসলেই কঠিন!
ড. সৌমিত জয়দ্বীপ সহকারী অধ্যাপক, স্কুল অব জেনারেল এডুকেশন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব