আমন মৌসুমে কৃষকদের চাহিদামতো সার না পাওয়া এবং নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে হওয়ার খবর নতুন করে শঙ্কা ও উদ্বেগ তৈরি করেছে। যেহেতু আমন উৎপাদনের সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি নিবিড়ভাবে জড়িত, তাই এই সংকট অত্যন্ত স্পর্শকাতর। বৈরী আবহাওয়া ও ডিজেল সংকটের কারণে এ বছর বোরো উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছায়নি। পাশাপাশি জুলাইয়ে টানা অতি ভারী বৃষ্টি ও বন্যায় চট্টগ্রাম, সিলেট ও উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আমনের বীজতলা ও চারার ক্ষতি হওয়ায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হওয়ার আশঙ্কা এমনিতেই বিদ্যমান। এর ওপর সারসংকট দেখা দিলে খাদ্যনিরাপত্তার ওপর তার প্রভাব পড়া অনিবার্য।
মুক্তকণ্ঠের অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহী ও যশোরের কৃষকেরা স্থানীয় পরিবেশকদের (ডিলার) কাছ থেকে সার পাচ্ছেন না। গ্রাম থেকে দূরে অবস্থিত পরিবেশকদের কাছে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সার মিললেও তা চাহিদামাফিক নয়। কোথাও ইউরিয়া পাওয়া গেলেও ডিএপি ও টিএসপি সারের সংকট দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ কৃষকের অভিযোগ, পরিবেশকেরা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পরিবেশকেরা সার নেই বলে ফিরিয়ে দিলে কৃষকদের সরকারি ভর্তুকির সার খোলাবাজার থেকে চড়া দামে কিনতে হচ্ছে।
শুধু রাজশাহী ও যশোর নয়, সার নিয়ে সারা দেশেই কৃষকেরা কমবেশি একই সংকটে পড়েছেন। গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের কারণে দেশে সার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে সার আমদানিতে চাপ ও খরচ বেড়েছে। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভাষ্যমতে, চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ কিছুটা কম হওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তবে এই ঘাটতি কোনোভাবেই সংকটময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে না। বরং সরকার নির্ধারিত পরিবেশকেরা ভর্তুকির সার কালোবাজারে বিক্রি করায় কৃষকেরা প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না বলে মনে করা হচ্ছে।
এক এলাকার সার অন্য এলাকায় পাচার, অবৈধ মজুত ও কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালত দুটি জেলায় কয়েকজন পরিবেশককে জরিমানা করেছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, অনিয়মের অভিযোগ পেলে তারা ব্যবস্থা নিচ্ছেন। তবে প্রশ্ন উঠেছে, কৃষি উৎপাদন ও পণ্যের দাম স্বাভাবিক রাখতে সরকার যে ভর্তুকি মূল্যে সার দেয়, তা কৃষকদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেই তদারকির দায়িত্ব কার? সারের কৃত্রিম সংকট তৈরির শাস্তি হিসেবে কেবল জরিমানাই কি যথেষ্ট?
জ্বালানি সংকটে দেশের অর্থনীতি যখন চাপের মুখে, তখন সারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীরা খাদ্যনিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছেন। ফলে এই অপরাধকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। বছরের পর বছর সার সিন্ডিকেটের কাছে কৃষকদের এই জিম্মিদশা চলছে। পরিবেশকেরা রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। কৃষি, কৃষক ও খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থেই এই সিন্ডিকেটের অবসান জরুরি।
ঋণ করে ফসল ফলায় কৃষকদের প্রয়োজনীয় সার, বীজ, সেচ ও কীটনাশক না পাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, অথচ ফসল বিক্রির সময় তারা ন্যায্য দাম পান না। এই দুষ্টচক্র থেকে কৃষি ও কৃষককে বের করে আনতে সবার আগে প্রয়োজন কার্যকর কৃষক নীতি ও সঠিক পরিকল্পনা।