গত বছরের ২১ আগস্ট অফিসের কথা বলে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন বিভুরঞ্জন সরকার। তারপর আর ফেরেননি তিনি। পরদিন দুপুরে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদী থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়। একটি মানুষ সকালে ঘর থেকে বের হলেন, পরিবারের মানুষ ভেবেছিলেন অন্য দিনের মতোই ফিরে আসবেন। কিন্তু সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত, রাত পেরিয়ে সকাল হলো; শেষ পর্যন্ত একটি নদী তাঁকে ফিরিয়ে দিল।
একজন আপন মানুষকে এভাবে হারানোর বেদনা কোনো ভাষাতেই পুরোপুরি প্রকাশ করা যায় না। বড়দা মারা যাওয়ার পর বিভুদাই হয়ে উঠেছিলেন পরিবারের সবচেয়ে বড় ভাই। মেঝদা বলে ডাকলেও তাঁর মধ্যে ছিল বড় ভাইয়ের দায়িত্ববোধ। পরিবারের সবার খোঁজখবর রাখা এবং সামর্থ্যের চেয়েও বেশি দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা করা ছিল তাঁর বৈশিষ্ট্য। আপনজনের বিপদে তিনি কথা বলার চেয়ে পাশে দাঁড়ানোয় বেশি বিশ্বাসী ছিলেন।
বন্ধু, সহকর্মী ও আত্মীয়স্বজনের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রিয়। মানুষের প্রতি সহজাত মমতা এবং কাউকে ছোট না করার মানসিকতার কারণে অনেকেই তাঁকে আপন করে নিয়েছিলেন। তবে নিজের জীবনের কষ্টের কথা তিনি খুব একটা বলতেন না। যে মানুষটি অন্যের কথা এত গভীরভাবে বুঝতেন, তাঁর নিজের কষ্টের কতটুকু বোঝা গিয়েছিল, তা নিয়ে রয়ে গেছে বড় আক্ষেপ। সম্মান ও স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা সব মানুষেরই থাকে, বিভুদাও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না; অথচ জীবনে এই স্বীকৃতিটুকুই তিনি সবচেয়ে কম পেয়েছেন।
বাংলাদেশে স্মার্ট রাজনৈতিক ধারাভাষ্য লেখার ক্ষেত্রে বিভুরঞ্জন সরকার ছিলেন একটি স্বতন্ত্র নাম। তাঁর লেখার সহজবোধ্যতা, বিশ্লেষণের গভীরতা, যুক্তির স্বচ্ছতা এবং ভাষার ভারসাম্য ছিল ঈর্ষণীয়। আশির দশকে সাপ্তাহিক 'যায় যায় দিন'-এ ছদ্মনামে প্রকাশিত 'তারিখ ইব্রাহিম'-এর কলাম সে সময়ের রাজনৈতিকভাবে সচেতন পাঠকদের কাছে ছিল প্রায় অবশ্যপাঠ্য।
তৎকালীন সময়ে তথ্যের সহজলভ্যতা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম না থাকায় সংবাদপত্র ও সাময়িকীর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ পাঠকদের চিন্তার জগতে বড় প্রভাব ফেলত। বিভুদার লেখার শক্তি ছিল জটিল রাজনৈতিক বিষয়কে সহজ করে তোলা। তিনি শুধু কী ঘটেছে তা বলতেন না, বরং কেন ঘটছে এবং এর পরিণতি কী হতে পারে, সেটিও বোঝানোর চেষ্টা করতেন। তাঁর লেখায় মেধা ও যুক্তি ছিল, কিন্তু ছিল না মেধার অহংকার বা পাঠককে ভয় দেখানোর প্রবণতা। ব্যঙ্গ ও রসবোধ থাকলেও সেখানে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ছিল না।
একজন রাজনৈতিক লেখকের সবচেয়ে বড় সম্পদ স্বাধীন বিবেক, যা বিভুদার ছিল। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার চেয়ে তিনি নিজের মতো করে ভাবাকে গুরুত্ব দিয়েছেন, যার ফলে তাঁর পথ কখনো মসৃণ হয়নি। দেশের একজন মেধাবী ও সৎ সাংবাদিক হয়েও জীবনের বড় একটা সময় তাঁকে রুটি-রুজির অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়তে হয়েছে। চাকরি পাওয়া, টিকিয়ে রাখা এবং নতুন করে শুরু করার লড়াই ছিল তাঁর জীবনের অংশ। সাংবাদিকতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা দীর্ঘ অনিশ্চয়তার এক কঠিন উদাহরণ ছিলেন তিনি।
আমাদের সমাজে অনেক সময় যোগ্যতার চেয়ে পরিচিতি এবং মেধার চেয়ে উচ্চকণ্ঠতা বড় হয়ে ওঠে। কেউ সামান্য কাজ করে বড় স্বীকৃতি পান, আবার কেউ অসাধারণ কাজ করেও নীরবে থেকে যান। বিভুদা ছিলেন সেই নীরব মানুষদের একজন। জীবিত অবস্থায় তিনি যে মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য ছিলেন, তার কতটুকু পেয়েছেন—সেই প্রশ্ন আজও তাড়িয়ে বেড়ায়। একজন সাংবাদিকের মূল্য কি শুধু পদবি, প্রতিষ্ঠান বা পুরস্কার দিয়ে মাপা যায়? নাকি তাঁর রেখে যাওয়া চিন্তা, সততা এবং পাঠকের মনে তৈরি করা প্রশ্নই শেষ পর্যন্ত বড় হয়ে থাকে? বিভুদার ক্ষেত্রে দ্বিতীয়টিই সত্য বলে বিশ্বাস করা হয়।
পেশাগত পরিচয়ের বাইরে তিনি ছিলেন পরিবারের প্রিয় মেঝদা। তাঁর বাসার দেয়ালে টাঙানো ছবিগুলো এখন এক অনুপস্থিত মানুষের উপস্থিতির দলিল। ছবির মানুষটি কথা বলেন না, কিন্তু তাঁর মুখ অনেক কথা বলে। মানুষ কি সত্যিই চলে যায়? হয়তো যায় না; থেকে যায় কণ্ঠস্বরে, ব্যবহারে, বইয়ের পাতায়, পুরোনো কাগজে এবং স্মৃতিতে। বিভুদা থেকে গেছেন তাঁর অসংখ্য লেখা, বই, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং সহকর্মী ও বন্ধুদের স্মৃতিতে।
তবে সবকিছুর পরও একটি কষ্ট থেকে যায়। আর একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা যাবে না, "কেমন আছিস?" কোনো রাজনৈতিক ঘটনার বিশ্লেষণ শোনা যাবে না বা লেখা নিয়ে তাঁর মতামত জানা যাবে না। আর কোনো দিন হঠাৎ ফোন করে বলা যাবে না, "মেঝদা, আগামী সংখ্যায় আমি কী নিয়ে লিখব?" এই না-পারাগুলোই মৃত্যুর সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা।
মেঘনার জল এক বছর ধরে অনেক দূর বয়ে গেছে, বদলেছে দেশের রাজনীতি। সংবাদপত্রের পাতায় প্রতিদিন নতুন খবরের ভিড়ে পুরোনো খবর হারিয়ে যায়। কিন্তু পরিবারের একটি খবর বদলায়নি—বিভুদা আর ফিরবেন না। বাসায় তাঁর লেখার চেয়ার-টেবিল, বই, পুরোনো কাগজপত্র ও ছবিগুলো আগের মতোই আছে, শুধু মানুষটি নেই। এই না থাকার সঙ্গে বেঁচে থাকাই এখন নিয়তি।
এক বছর আগে মেঘনা নদী বিভুদার শরীরটাকে নিয়ে গেছে, কিন্তু তাঁর হাসি, কণ্ঠস্বর, লেখা, মমতা, অভিমান এবং অসমাপ্ত কথাগুলো রয়ে গেছে আমাদের মধ্যেই। তাই মনে হয়, বিভুদা কোথাও হারিয়ে যাননি, শুধু চোখের আড়ালে চলে গেছেন। তারপরও মন মানে না; বারবার মনে হয়, যদি আর একবার তাঁকে দেখা যেত, আর একবার যদি সেই চেনা হাসিটা দেখা যেত! শুধু একবার!
—চিররঞ্জন সরকার, লেখক ও কলামিস্ট।