প্রবাসীদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি সত্যায়নের ক্ষেত্রে অভিন্ন নির্বাহী নির্দেশনা জারি না করা এবং তা বাস্তবায়নে নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। একইসঙ্গে এই বিষয়ে অভিন্ন সার্কুলার, নির্বাহী নির্দেশনা ও প্রশাসনিক গাইডলাইন (নীতিমালা) জারি করার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, সেই প্রশ্নও রুলে রাখা হয়েছে।

বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি এস এম ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ সোমবার এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানিতে এই রুল দেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নূর ই আলম আবেদনকারী হয়ে এই রিটটি দায়ের করেন। রিটে উল্লেখ করা হয়, প্রবাসীদের নোটারাইজড (দলিল, চুক্তি বা কোনো কাগজপত্র নোটারি করা) ও অ্যাপোস্টিল (স্বীকৃতি সনদ বা সিল) করা নথি বাংলাদেশের দূতাবাস, হাইকমিশন ও কনস্যুলেটে গ্রহণ না করে পুনরায় প্রত্যায়ন, পাল্টা প্রত্যায়ন বা কনস্যুলার অথেন্টিকেশন (কোনো দেশের নাগরিকের সরকারি বা ব্যক্তিগত নথি অন্য দেশে ব্যবহারের জন্য বৈধ করা) চাওয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, সুস্পষ্ট ও অভিন্ন নির্দেশনা না থাকায় বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ মিশনে নথি গ্রহণের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। কোনো মিশন অ্যাপোস্টিল করা নথি গ্রহণ করলেও অন্য কোনো মিশন একই ধরনের নথির জন্য অতিরিক্ত বৈধকরণ বা পাল্টা প্রত্যায়ন দাবি করে।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ইশরাত হাসান, তাঁকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী তানজিলা রহমান ও মো. আরশাদুর রহমান। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল খাঁন জিয়াউর রহমান।

রিট আবেদনকারী পক্ষ জানিয়েছে, হেগ অ্যাপোস্টিল কনভেনশন অনুযায়ী উৎসরাষ্ট্রে যথাযথভাবে অ্যাপোস্টিল করা পাবলিক ডকুমেন্ট (সরকারি দলিল বা নথি) অতিরিক্ত সত্যায়ন ছাড়াই গ্রহণের জন্য বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের সব মিশনে অভিন্ন নির্বাহী নির্দেশনা জারি ও বাস্তবায়নে নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতা কেন বেআইনি ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। এছাড়া ওই কনভেনশনের বাস্তবায়ন নিশ্চিতে সব দূতাবাস, হাইকমিশন ও কনস্যুলেটের প্রতি অবিলম্বে অভিন্ন সার্কুলার, নির্বাহী নির্দেশনা ও প্রশাসনিক গাইডলাইন জারি করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে।

আইনজীবী ইশরাত হাসান আরও জানান, আইন মন্ত্রণালয়ের ২০২৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বরের সার্কুলার এবং ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বরের এসআরও বিদেশে অবস্থিত সব বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনস্যুলেটে বাস্তবায়নের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা-ও রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে।

আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, "বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিক, শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন প্রয়োজনে জন্মসনদ, বিবাহসনদ, শিক্ষাগত সনদ, আদালতের নথি, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি এবং অন্যান্য সরকারি দলিল বাংলাদেশে ব্যবহার করতে হয়। নথিগুলো উৎসরাষ্ট্রে আইন অনুযায়ী নোটারাইজড ও অ্যাপোস্টিল করার পরও অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মিশন থেকে আবার সত্যায়ন বা পাল্টা সত্যায়ন নিতে বলা হয়। ফলে একই নথি নিয়ে একজন ব্যক্তিকে একাধিক সরকারি দপ্তর, নোটারি, অ্যাপোস্টিল কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ মিশনে ঘুরতে হয়। কোনো কোনো দেশে বাংলাদেশ দূতাবাস সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বাসস্থান থেকে কয়েক শ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সেখানে যেতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। পাশাপাশি যোগ হয় অ্যাপয়েন্টমেন্টের অপেক্ষা, কর্মস্থল থেকে ছুটি, যাতায়াত ও আবাসন ব্যয় এবং কুরিয়ারযোগে মূল নথি পাঠানোর ঝুঁকি।"

তিনি আরও উল্লেখ করেন, অতিরিক্ত সত্যায়নের জন্য অনেক ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ বা মাস সময় চলে যায়। এর ফলে "শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সময়সীমা পার হয়ে যেতে পারে ও চাকরিতে যোগদান বিলম্বিত হতে পারে। ভিসা বা অভিবাসনপ্রক্রিয়াও আটকে যেতে পারে। এমনকি বিবাহ নিবন্ধন, সন্তানের জন্মনিবন্ধন, সম্পত্তি হস্তান্তর ও উত্তরাধিকার কিংবা আদালতের কার্যক্রম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। একই নথির পেছনে বারবার অর্থ ব্যয় কেবল প্রশাসনিক জটিলতা নয়, বরং বাস্তব অর্থে আর্থিক ও মানসিক হয়রানিও।"

প্রবাসীদের এই ভোগান্তি নিরসনের লক্ষ্যেই রিটটি করা হয়েছে বলে জানান আইনজীবী ইশরাত হাসান।