বাংলাদেশের মানুষের আর্জেন্টিনা-প্রীতি নতুন নয়। বিশ্বকাপ এলেই হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দেশটির জন্য এ দেশের মানুষের আবেগ ছড়িয়ে পড়ে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত। সেই ভালোবাসার কথা আগে থেকেই জানতেন আর্জেন্টিনার সাবেক তারকা ক্লদিও ক্যানেজিয়া। এবার ঢাকায় এসে সেটি কাছ থেকে দেখার সুযোগ হলো তার।

সোমবার রাজধানীর ফর্টিস ডাউনটাউন রিসোর্ট ও গ্রাউন্ডসে ঢাকা ইন্টারস্কুল চ্যাম্পিয়নস লিগ ২০২৬-এর গ্র্যান্ড ফাইনালে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দিয়েগো ম্যারাডোনার সাবেক সতীর্থ ক্যানেজিয়া। তরুণ ফুটবলারদের সঙ্গে সময় কাটানোর পাশাপাশি পুরস্কার বিতরণ ও সংবাদ সম্মেলনেও অংশ নেন তিনি।

বাংলাদেশে এসে পাওয়া অভ্যর্থনায় মুগ্ধ ক্যানেজিয়া জানিয়েছেন, আর্জেন্টিনার প্রতি এ দেশের মানুষের ভালোবাসার খবর তার অজানা ছিল না।

তিনি বলেন, ‘আমি অবাক হইনি। ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনা যখন খেলতেন, তখন থেকেই এই সমর্থনের শুরু। টেলিভিশনে দেখেছি এখানকার মানুষ কীভাবে আর্জেন্টিনার জয় উদযাপন করে।’

বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-সমর্থকদের আবেগকে অন্যরকম বলেই মনে করেন সাবেক এই ফরোয়ার্ড, ‘পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গাতেই বড় দলগুলোর সমর্থক আছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো এমন উন্মাদনা খুব কম জায়গায় দেখা যায়। একটি দেশের এত মানুষ অন্য একটি জাতীয় দলকে এভাবে সমর্থন করে, এটা দারুণ ব্যাপার।’

বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা নিয়েও আশার কথা শুনিয়েছেন ক্যানেজিয়া। তবে শুধু স্বপ্ন দেখলেই হবে না, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সঠিক কাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি।

ক্যানেজিয়া বলেন, ‘বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়া সব সময়ই কঠিন। কিন্তু গত ১০-২০ বছরে অনেক দেশ যেভাবে এগিয়েছে, বাংলাদেশও তা করতে পারে। ভবিষ্যতে বিশ্বকাপে হয়তো ৬২ বা ৬৪টি দল খেলবে। তাহলে বাংলাদেশ কেন বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন দেখবে না?’

এই লক্ষ্য পূরণে সরকারের সহায়তা, মানসম্পন্ন কোচিং এবং ফুটবলারদের মানসিক দৃঢ়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন আর্জেন্টিনার সাবেক এই তারকা।

বাংলাদেশ দলে হামজা চৌধুরীর মতো ইউরোপে খেলার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ফুটবলারের উপস্থিতিকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ক্যানেজিয়া। তিনি বলেন, ‘ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলে এমন একজন ফুটবলার পাওয়া অসাধারণ ব্যাপার। ইউরোপের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় খেলার অভিজ্ঞতা জাতীয় দলের উন্নতিতে অনেক সাহায্য করতে পারে।’

সংবাদ সম্মেলনে স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে ম্যারাডোনার প্রসঙ্গ। আর্জেন্টিনা দলে দুজনের বন্ধুত্ব এবং বিখ্যাত গোল উদযাপনে তাদের চুমুর ছবিটি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে হাসতে হাসতে ক্যানেজিয়া সেটিকে শুধুই ‘বন্ধুত্বপূর্ণ চুমু’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

লিওনেল মেসিকে ২০৩০ বিশ্বকাপে দেখা যাবে কি না, সে প্রশ্নেও নিজের মত দিয়েছেন ক্যানেজিয়া। তার মতে, বয়সের কারণে কাজটি কঠিন হলেও মেসির ক্ষেত্রে কোনো কিছুই পুরোপুরি অসম্ভব বলা যায় না।

তিনি বলেন, ‘মেসির জন্য ২০৩০ বিশ্বকাপে খেলা কঠিন হবে। তবে সে ফুটবলের জাদুকর। চাইলে ৪১-৪২ বছর বয়স পর্যন্তও খেলতে পারে। কিন্তু সে মানসিকভাবে সেটি করতে চায় কি না, সেটিই আসল বিষয়।’

২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার হার নিয়েও কথা বলেন ক্যানেজিয়া। তার মতে, ফাইনালে স্পেনই ভালো দল ছিল এবং তাদের শিরোপা জয় প্রাপ্য। আর্জেন্টিনার পরাজয়ের পেছনে ফিফার কোনো ষড়যন্ত্র ছিল বলেও মনে করেন না তিনি।

বাংলাদেশ জাতীয় দলের সঙ্গে ভবিষ্যতে কাজ করার আগ্রহ আছে কি না, এমন প্রশ্নে দরজা খোলা রেখেছেন ক্যানেজিয়া।

তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো প্রস্তাব পাইনি। যদি আসে, অবশ্যই বিবেচনা করব। যে দল সামনে এগিয়ে যেতে চায়, তাদের সঙ্গে কাজ করা আনন্দের। কখনো বিশ্বকাপে না খেলা কোনো দলকে নিয়ে বিশ্বকাপের স্বপ্ন দেখায় বাধা কোথায়?’

অনুষ্ঠানে ফর্টিস এফসির সভাপতি শাহিন হাসান বলেন, ক্যানেজিয়ার মতো একজন বিশ্বখ্যাত সাবেক ফুটবলারের উপস্থিতি তাদের বয়সভিত্তিক খেলোয়াড়দের জন্য বড় অনুপ্রেরণা।

তিনি বলেন, ‘ক্যানেজিয়ার মতো একজন কিংবদন্তি আমাদের ইয়ুথ একাডেমির খেলোয়াড়দের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। এটি ভবিষ্যতের জন্য তাদের অনেক বড় প্রেরণা দেবে।’

অনুষ্ঠানের অংশীদার ইফাদ গ্রুপের প্রধান নির্বাহী আরিফ জামান তরুণদের মাঠমুখী করতে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও বেশি সম্পৃক্ততার আহ্বান জানান। তরুণ প্রজন্মকে অতিরিক্ত পর্দানির্ভর জীবন থেকে বের করে খেলাধুলায় ফেরাতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার কথাও বলেন তিনি।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মার্সেলো কার্লোস সেসা। ক্যানেজিয়ার সফর বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমী ও তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য অনুপ্রেরণার হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

১৯৯০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ক্যানেজিয়ার ঢাকায় আসা তাই শুধু আর্জেন্টিনাপ্রেমীদের জন্যই নয়, বাংলাদেশের তরুণ ফুটবলারদের জন্যও হয়ে উঠল বিশেষ এক উপলক্ষ।