ফেনীর দাগনভূঞায় ফেনী-নোয়াখালী মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাসের নিচে চাপা পড়ে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তার সুরাইয়া নিহত হন। দুর্ঘটনার পর আরও আট শিক্ষার্থী আহত হন। নিহত ফাতেমাসহ হতাহতরা সবাই সিলোনিয়া হাইস্কুলের শিক্ষার্থী।
রোববার বিকেলে সাড়ে চারটার দিকে দুর্ঘটনার ঘটনাস্থল থেকে ১৫০ গজ দূরে আজ সোমবার সকাল ১০টায় তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সড়কের একপাশ কিছুক্ষণ বন্ধ রেখে স্বজন, প্রতিবেশী, রাজনৈতিক দলের নেতা এবং সিলোনিয়া হাইস্কুলের শিক্ষক-সহপাঠীরা জানাজায় অংশ নেন।
ঘটনার দিন প্রতিদিনের মতো মেয়ের অপেক্ষায় বাড়ির সামনের এলাকায় বসেছিলেন মা বিবি জোহরা। বাড়ি থেকে হাঁটা দূরত্বেই স্কুল। চারটায় ছুটি শেষে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফাতেমা সাধারণত ঘরে ফেরে। তবে সেদিন সাড়ে চারটা পার হলেও সে ফিরে আসেনি। দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকায় বাড়ির সামনের রাস্তায় এগিয়ে গেলে মেয়ের এক সহপাঠী হন্তদন্ত হয়ে আসতে দেখা যায়। কাছাকাছি এসেই সে জানায়, ফাতেমা বড় রাস্তায় বাসের নিচে চাপা পড়েছে।
এরপরই জোহরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। বড় রাস্তায় লোকজনের ভিড় ছিল। তিনি শুনতে পান, বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী চাপা পড়েছে। তবে সেখানে নিজের মেয়েকে দেখতে পাননি। চাকার নিচে একটি নিথর দেহ দেখলেও চিনতে পারেননি। পরে ফিরে শুনতে পান, আহতদের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। সেখানে গিয়ে বুঝতে পারেন, চাকার নিচে চাপা পড়া নিথর দেহটা তাঁরই বুকের ধন ফাতেমা।
গতকাল রোববার বিকেলে ফেনীর দাগনভূঞায় ফেনী-নোয়াখালী মহাসড়কের সিলোনিয়া বাজার এলাকায় যাত্রীবাহী বাসের নিচে চাপা পড়ে ফাতেমা আক্তার সুরাইয়া (১২) মারা যায়। আহতদের মধ্যে চারজন ফেনীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে। এ ছাড়া দুজন দাগনভূঞা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং দুজনকে ফেনীর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে স্বজনেরা এক শিক্ষার্থীকে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান।
দুর্ঘটনার খবরে আজ সকালে দাগনভূঞা উপজেলার জায়লস্কর ইউনিয়নের চাঁদপুর গ্রামে ফাতেমাদের বাড়িতে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড় দেখা যায়। ফাতেমার বাবা মোহাম্মদ হানিফ দীর্ঘ বহু বছর সৌদিপ্রবাসী ছিলেন; মেয়ের টানে গত বছর দেশে ফিরে এসেছিলেন। মেয়েকে হারিয়ে বাক্রুদ্ধ তিনি। বাড়ির একটি কক্ষে ফাতেমার কাদামাখা স্কুলব্যাগ বুকে জড়িয়ে মা বিবি জোহরা বিলাপ করছেন।
স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হানিফ-জোহরা দম্পতির এক ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে ফাতেমা ছিল ছোট। বিয়ের পর ৯ বছরের মাথায় ছেলেসন্তানের জন্ম হলে আরেকটি কন্যাসন্তান চেয়েছিলেন তাঁরা। বিয়ের ২১ বছরের মাথায় সে আশা পূরণ হয় হানিফ-জোহরার। ঘর আলো করে জন্ম নেয় মেয়ে ফাতেমা আক্তার সুরাইয়া। জন্মের পর থেকে আদর-ভালোবাসার কমতি ছিল না মেয়ের জন্য। ফাতেমার সব চাহিদা, আবদার পূরণ করেছেন মা-বাবা—এভাবেই কাঁদতে কাঁদতে দুর্ঘটনার বিবরণ দিচ্ছিলেন মা বিবি জোহরা। তিনি বলেন, ‘মেয়েটা যাওয়ার আগে বারবার বলছিল, আম্মু নাশতা দাও, প্রাইভেট শুরু হয়ে যাচ্ছে। আমি চলে যাচ্ছি।’
এর আগে তিনি মেয়েকে টিফিন বক্সও এগিয়ে দিয়েছিলেন বলে জানান। এরপর আর কোনো কথা হয়নি।
বাবা মোহাম্মদ হানিফ জানান, প্রবাসে আয় করা টাকা দিয়ে বাড়ি করেছেন তিনি। ছেলেমেয়েদের জন্য আলাদা আলাদা কক্ষ ছিল বাড়িতে। বড় ছেলে পড়ালেখার সুবিধার্থে ঢাকায় থাকে। ছোট মেয়ে ফাতেমাকে নিয়েই মা-বাবার সংসার। মেয়েকে চোখের আড়াল করতে চাননি বলে বাড়ির পাশে তিন শ গজ দূরত্বে সিলোনিয়া হাইস্কুলে ভর্তি করান মা-বাবা। প্রতিদিন সকালে বাড়ি থেকে প্রতিবেশী সহপাঠীদের সঙ্গে হেঁটেই স্কুলে যায় ফাতেমা। স্কুল শেষে মহাসড়ক পাড়ি দিয়ে হেঁটেই আবার বাড়ি ফেরে।
দুর্ঘটনার পর অনেকক্ষণ পর কথা বলে ওঠেন হানিফ। তিনি বলেন, ‘আমি যখন দুর্ঘটনার কথা শুনেছি, তখন কল্পনাও করিনি, আমার ছোট মেয়ে এভাবে আমাকে ছেড়ে চলে যাবে। আমার সবকিছু সে খেয়াল রাখত, আমি দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকায় আমার ওষুধ খাওয়া বিষয়টি নিয়মিত দেখভাল করত ফাতেমা। আল্লাহ আমার নিষ্পাপ মেয়েটাকে আমার থেকে কেন এত তাড়াতাড়ি নিয়ে গেল?’
ফাতেমার মৃত্যুর ঘটনায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে বিক্ষোভ করেছে সিলোনিয়া হাইস্কুলের কয়েক শ শিক্ষার্থী। নোয়াখালী থেকে ফেনীমুখী সড়ক অবরোধ করে তারা কর্মসূচি পালন করে। এ সময় তারা হত্যাকারীর গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করে। পাশাপাশি ওই স্থানে পদচারী–সেতু নির্মাণের দাবি জানায় তারা।
বিক্ষোভে সিলোনিয়া হাইস্কুলের শিক্ষক মো. আরিফুর রহমান বলেন, মহাসড়কের পাশে সিলোনিয়া বাজার এলাকায় প্রতিদিন সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী যাতায়াত করে। অবিলম্বে মহাসড়কের এই অংশে জেব্রা ক্রসিং, স্পিডব্রেকার, পদচারী– সেতু নির্মাণ করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
ফেনীর মহিপাল হাইওয়ে থানা-পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) কবির হোসেন বলেন, ঘটনার পরপরই বাসচালক ও সহকারী পালিয়ে যান। তিনি জানান, নিহতের পরিবারের সদস্যরা দাফন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় সোমবার দুপুর পর্যন্ত মামলা করতে পারেননি।