রাত গভীর হওয়ার পর হঠাৎ বুকে চাপ বা ব্যথা অনুভব করা অনেক সময় প্রাণঘাতী হতে পারে। অনেকেই এই ব্যথাকে সাধারণ গ্যাসের সমস্যা বা বদহজম মনে করে অবহেলা করেন, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, বুকে ব্যথা মানেই হৃদ্রোগ নয়; এটি পেশিতে টান বা উদ্বেগের কারণেও হতে পারে। তবে বাড়িতে বসে কোনটি সাধারণ আর কোনটি জরুরি সংকেত, তা বোঝা কঠিন।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন তীব্র বুকের ব্যথা হলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নেওয়ার পরামর্শ দেয়। হঠাৎ বুকে ব্যথা শুরু হলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। ব্যথা কমে যাবে কি না বা গ্যাসের ওষুধ খেলে ঠিক হবে কি না—এসব ভেবে সময় নষ্ট করা বিপজ্জনক। হৃদ্রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসা যত দ্রুত শুরু করা যায়, হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতি তত কমানো সম্ভব।
বুকের ব্যথার ধরন ও লক্ষণ
হৃদ্রোগের ব্যথা সবসময় তীব্র বা অসহনীয় নাও হতে পারে। অনেক সময় বুকের মাঝখানে চাপ, ভারী ভাব বা অস্বস্তির মতো অনুভূতি হতে পারে। এই ব্যথা হাত, কাঁধ, ঘাড়, চোয়াল, পিঠ বা ওপরের পেটে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ব্যথার পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, দ্রুত হৃদ্স্পন্দন বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে লক্ষণ কিছুটা ভিন্ন হতে পারে; তাদের ক্ষেত্রে বুকের ব্যথার পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট, বমি ভাব, পিঠ বা চোয়ালে ব্যথা এবং অস্বাভাবিক ক্লান্তি দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
১৫ মিনিট অপেক্ষা করা কি ঠিক?
বুকের ব্যথার ক্ষেত্রে প্রথম ১৫ মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, ১৫ মিনিট পূর্ণ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করা উচিত নয়। ব্যথা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নেওয়া নিরাপদ।
প্রাথমিক পদক্ষেপ ও সতর্কতা
আক্রান্ত ব্যক্তিকে কখনোই একা রাখা উচিত নয়। তাকে আরামদায়ক অবস্থায় বসতে বা বিশ্রাম নিতে সাহায্য করতে হবে এবং অযথা হাঁটাহাঁটি বা সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে দেওয়া যাবে না। সম্ভব হলে পরিবারের অন্য কাউকে দ্রুত জানান। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন বলছে, "বুকের ব্যথায় নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার চেয়ে জরুরি চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে হাসপাতালে যাওয়া ভালো।" এতে পথে চিকিৎসা শুরু করার সুযোগ থাকে এবং হাসপাতালে পৌঁছানোর পরও দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
অ্যাসপিরিন ব্যবহারের নিয়ম
অ্যাসপিরিন সবার জন্য নিরাপদ নয়। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন ও আমেরিকান রেড ক্রসের ২০২৪ সালের প্রাথমিক চিকিৎসা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, "তীব্র বুকের ব্যথায় সচেতন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে জরুরি চিকিৎসাসেবায় যোগাযোগ করার পর ১৬২ থেকে ৩২৫ মিলিগ্রাম অ্যাসপিরিন চিবিয়ে গিলে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে, যদি তার অ্যাসপিরিনে অ্যালার্জি না থাকে এবং চিকিৎসক আগে থেকে অ্যাসপিরিন না খেতে বলে না থাকেন।" তবে ওষুধ নিয়ে সন্দেহ থাকলে জরুরি চিকিৎসাকর্মীদের পরামর্শ নেওয়া শ্রেয়।
ঝুঁকির বিষয়সমূহ
যাদের আগে হৃদ্রোগের সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে নতুন করে ব্যথা শুরু হলে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে। তবে বয়স, উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান, উচ্চ কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং পারিবারিক ইতিহাস থাকলে যে কেউ ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। এমনকি ব্যথা সাময়িকভাবে কমে গেলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি, কারণ হৃদ্রোগের উপসর্গ সব সময় একটানা থাকে না।
জরুরি অবস্থা ও অচেতনতা
যদি আক্রান্ত ব্যক্তি অচেতন হয়ে পড়েন এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নেন, তবে দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবার সহায়তা নিতে হবে। প্রশিক্ষণ থাকলে হৃদ্যন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা ও বুকে চাপ দেওয়ার ব্যবস্থা শুরু করতে হবে। কারণ হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেলে প্রতিটি মিনিট অত্যন্ত মূল্যবান।