ঘুমাতে গিয়ে হঠাৎ মনে হয়, আপনি বুঝি পড়ে যাচ্ছেন—কেউ কেউ চমকে ওঠেন, কেউ আবার কেঁপে ওঠেন হাত-পা। এমন অভিজ্ঞতা কি কখনো হয়েছে আপনারও? বিষয়টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা জানতে স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের নিউরোমেডিসিন বিভাগের বিশেষজ্ঞ ডা. ইসরাত জেরিন আলম-এর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন রাফিয়া আলম।
ঘুমের সময় অনেকেরই হঠাৎ মনে হয়, পড়ে যাচ্ছি। তখন শরীরের পতন ঠেকাতে নড়াচড়ে হাত-পা কেঁপে উঠতে পারে। সাধারণত শরীরের কোনো এক পাশ নড়ে ওঠে। এই নড়াচড়ায় ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ থাকে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন ঘটনাকে ‘হিপনিক জার্ক’ বলা হয়। এ কারণে চমকে গিয়ে ঘুম ভেঙেও যেতে পারে এবং অস্বস্তিও হতে পারে।
শোয়া অবস্থাতেই হিপনিক জার্ক হলেও কারও কারও কাছে মনে হতে পারে, তিনি দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থান থেকে পড়ে যাচ্ছেন কিংবা হাঁটতে হাঁটতে পড়ে যাচ্ছেন। তখন তিনি একটি স্বপ্নের মতো আবেশে থাকতে পারেন। তবে তা আসলে স্বপ্ন নয়; বরং হ্যালুসিনেশন (ভ্রম)।
কখনো কখনো দেখা যায়, হিপনিক জার্কে ব্যক্তির ঘুম না ভেঙলেও শরীরের এই আকস্মিক নড়াচড়া টের পেয়ে পাশে থাকা মানুষটিও চমকে উঠতে পারেন।
পৃথিবীব্যাপী বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, হিপনিক জার্ক মস্তিষ্কের ‘মিসফায়ার’-এর জন্য ঘটে। ঘুমানোর সময় শরীরের পেশিগুলো শিথিল থাকে এবং মস্তিষ্কও বিশ্রামে থাকে। কিন্তু ঘুম ও জাগরণের মাঝামাঝি সময়ে শরীর যখন শিথিল হতে শুরু করে, তখন মস্তিষ্কের কিছু অংশ—বিশেষ করে রেটিকুলার অ্যাক্টিভেটিং সিস্টেম, যা পেশির নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে—পুরোপুরিভাবে ঘুমের সংকেত না-ও পাঠাতে পারে।
এ সময় শরীরের শিথিল হওয়াকে ‘পতন’ বা বিপদের সংকেত হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করে মস্তিষ্ক পেশিকে সংকুচিত হতে নির্দেশ দিতে পারে। এটাই হিপনিক জার্ক। অর্থাৎ মস্তিষ্ক শরীরকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যেই সংকেত পাঠালেও তা হচ্ছে ‘মিসফায়ার’—যে ‘ফায়ার’ করার প্রয়োজন আদতে ছিল না, কারণ শরীর বিছানাতেই নিরাপদ অবস্থায় থাকে।
হিপনিক জার্কের নির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। গবেষণার ফলাফল বলছে, মোটামুটিভাবে ৭০ শতাংশ মানুষেরই জীবনে কখনো না কখনো হিপনিক জার্ক হয়েছে। সাধারণত শৈশবের চেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যাওয়ার পর এ ঘটনা বেশি দেখা যায়। তবে সেটি মস্তিষ্কের বয়সজনিত কোনো পরিবর্তনের কারণে নয়।
মস্তিষ্কের বিশ্রামে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে এমন কিছু বিষয়—
মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা; ঘুমের ঘাটতি; ঘুমের আগে ভারী ব্যায়াম; নিকোটিন; অ্যালকোহল; এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইন বা ঘুমের আগে ক্যাফেইন।
হিপনিক জার্ক হলে মস্তিষ্ক বা শরীরের কোনো ক্ষতি হয় না। তবে বিষয়টি অস্বস্তির কারণ হতে পারে। তাই হিপনিক জার্ক কমানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব না-ও হতে পারে। প্রায়ই এমন হলে এসব বিষয়ে নজর দেওয়া যেতে পারে—
মানসিক চাপ এবং দুশ্চিন্তা কমাতে চেষ্টা করুন। ইতিবাচক চিন্তা করুন। ঘুমের আগে ধ্যান করতে পারেন, হালকা ধরনের বই পড়তে পারেন, কুসুম গরম পানিতে গোসল করতে পারেন, পোশাক বদলে নেওয়াও ভালো।
রোজ একই সময়ে ঘুমাতে এবং উঠতে চেষ্টা করুন, এমনকি ছুটির দিনেও।
ঘুমের সময় ঘর যেন অতিরিক্ত গরম বা অতিরিক্ত ঠান্ডা না থাকে।
নিয়মিত শরীরচর্চা করুন। তবে ঘুমের আগে ভারী ব্যায়াম না করাই ভালো।
ধূমপান এবং অ্যালকোহল গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন।
অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ করবেন না। ঘুমের আগে ক্যাফেইন এড়িয়ে চলুন। মনে রাখবেন, কেবল চা-কফিতেই নয়, এনার্জি ড্রিংক এবং চকলেটেও ক্যাফেইন থাকে।
এ ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে—ঘুমের মধ্যে হিপনিক জার্ক ছাড়া যদি অন্য ধরনের নড়াচড়া বা খিঁচুনি হয়; ঘুমের সময় ছাড়া অন্য সময় অর্থাৎ জেগে থাকা অবস্থাতেও শরীরের কোনো পেশি কেঁপে ওঠে বা নড়ে ওঠে; এবং ঘুমের মধ্যে কেউ চিৎকার করেন, ধস্তাধস্তি করেন, পাশের মানুষটাকে আঘাত করেন, কোনো কিছু খাওয়ার চেষ্টা করেন কিংবা অন্য কোনো অস্বাভাবিক কাজ করেন।
ঘুমের মধ্যে হাত–পা অতিরিক্ত নড়াচাড়ার পাশাপাশি আরেকটি সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে—ঘুমের মধ্যে দাঁত কিড়মিড়ের বিষয়টি নিয়ে জানতে হলে ‘নাইট ব্রুকসিজম’ প্রসঙ্গটি দেখার পরামর্শ রয়েছে।