তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রিত্বের ছয় মাস পূর্ণ হলো। মেয়াদের ১০ ভাগের ১ ভাগ সময় পার হলো তাঁর দলের। পাঁচ বছর মেয়াদি সরকারের জন্য ছয় মাস খুব বেশি সময় নয়, অনেক কমও নয়। ঘরে-বাইরে এই ছয় মাসের চাওয়া-পাওয়া ও সামর্থ্যের কিছু হিসাব হবে এখন। সরকার নিজেও নিশ্চিতভাবে একটা মূল্যায়ন করবে।

দায়িত্ব নেওয়ার সময় ১৮০ দিনের একটা প্রাথমিক কর্মসূচি-পর্বের কথা সরকারি মহল থেকে বলা হয়েছিল। হয়তো তার একটা অডিট বা নিরীক্ষা হবে এখন। শুরুর মুহূর্তটা আশাপ্রদ ছিল, যখন প্রধানমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের করমুক্ত গাড়ি আমদানি ও প্লট-সুবিধা বন্ধের কথা বলছিলেন। কিন্তু এখন গ্রাম-শহরে আনন্দের রেশে টান পড়েছে।

শহরগুলোর গতি কমিয়ে দিচ্ছে জ্বালানির অপ্রতুল সরবরাহ। এটা প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্প খাতে মরণকামড় দিয়েছে। কাজের সুযোগ কমে আসা মানে বেকারত্ব বাড়া। যাঁদের কাজকর্ম আছে, তাঁদেরও আয় কমছে। চিনি, গম, তেলের মতো জরুরি পণ্য প্রক্রিয়াজাতের বেলায়ও গ্যাসের অভাব বাজারকে শাসাচ্ছে। মনে হচ্ছে জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতের সংকট ও সম্ভাবনা সম্পর্কে পূর্বানুমান ও প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল সংশ্লিষ্টদের।

.বিএনপি সরকার ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে .সংস্কারের চেতনা থেকে সরকার অনেকটা সরে এসেছে.

বাংলাদেশে যেকোনো সরকারই অতীত থেকে অনেক সংকটের ধারাবাহিকতা পায়। বিএনপিরও সে রকম দুর্ভাগ্য ছিল। তবে ফেব্রুয়ারিতে সরকার বলছিল তাদের হাতে ‘প্ল্যান’ রয়েছে। তারা অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে চায়। তাদের ‘৩১ দফা’র ১৭তম দফায় আছে, ‘আমদানিনির্ভরতা বাদ দিয়ে নবায়নযোগ্য ও মিশ্র এনার্জিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং উপেক্ষিত গ্যাস ও খনিজ সম্পদ আবিষ্কার ও আহরণে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ এখনই কি সেটা শুরুর সময় নয়? অথচ এখন শুনছি জ্বালানি খাত বেসরকারীকরণের কথা।

শুরুর মাসে সরকার অনেক কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যাংকঋণ মওকুফ করেছিল। এতে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় প্রায় ১৩ লাখ কৃষকের তাৎক্ষণিক উপকার হয়। কিন্তু কৃষি উপকরণ ও ফসল বিক্রির বেলায় পুরোনো সংকট থেকে চাষি-সমাজ রেহাই পাচ্ছে না। ৩১ দফার ২৭তম দফা ছিল কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য বিষয়ে। সেখানে আরও অনেক প্রতিশ্রুতি আছে। গত ছয় মাসে এসব বিষয়ে আলাপ জোর পেল কি?

.

নতুন সরকারের কাছে মানুষের তাৎক্ষণিক চাওয়া ছিল আইনশৃঙ্খলায় উন্নতি। ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর উদ্দেশে প্রথম ভাষণে বলেছিলেন এটা তাঁর ‘সরকারের অগ্রাধিকার’। অথচ চাঁদাবাজি ও খুনোখুনির পাশাপাশি যত্রতত্র ‘প্রেশার কুকার’ আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে সক্ষম এসব বোমা বানিয়ে এখানে-সেখানে রেখে যাওয়া বেশ রহস্যময় ঠেকছে। ভবিষ্যতে এসব কোথায় কখন কাদের বিরুদ্ধে কারা ব্যবহার করবে, সেটা ভেবে আতঙ্কিত না হয়ে পারা যায় না।

জ্বালানি ও আইনশৃঙ্খলায় স্বস্তি হলো সব সময় সব ধরনের বিনিয়োগকারীদের প্রথম চাওয়া। সেখানে টানাপোড়েন চলতে থাকায় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমিয়ে বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। কিন্তু জ্বালানিসংকট খেলাপি ঋণের পুরোনো ব্যাধি আরও জটিল করবে বলেই ইঙ্গিত মিলছে। ব্যবসা কমলে রাজস্বও কমবে। এ রকম সংকটগুলো দুষ্টচক্রের মতো। উত্তরাধিকারসূত্রে সংকটগ্রস্ত ব্যাংক খাত পেয়েছিল সরকার। অনেকগুলো ব্যাংকে লাখ লাখ গ্রাহকের ডিপোজিট আটকে আছে। ছয় মাসেও গ্রাহকেরা সন্তুষ্ট হওয়ার মতো কোনো খবর পেলেন না।

.১০০ দিন পর বিএনপি সরকারের ভবিষ্যৎ পরীক্ষা .আড়াই মাসেই জন–আস্থার পরীক্ষায় সরকার.

এসব হয়তো সেই মৌলিক সত্যই সামনে আনছে, পুরোনো ধাঁচে এ দেশ পরিচালনা দুঃসাধ্য হবে। কেন্দ্রীভূত ব্রিটিশ প্রশাসন দিয়ে ২০২৬ সালের বাংলাদেশের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয়। কাজের ভার অনেকখানি দিতে হবে স্থানীয় সরকারকে। সে রকম কিছু ঘটেনি এর মধ্যে। সেটা ঘটার আগেই স্থানীয় সরকারের দপ্তরে সংসদ সদস্যদের অফিস তৈরির সিদ্ধান্ত হলো! এগোনোর বদলে পেছনে হাঁটলাম আমরা।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশগুলো মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রণালয়ে আটকে যাওয়াও দুর্ভাগ্যজনক। ছোট ছোট অনেক উদাহরণ দেওয়া যায় এ বিষয়ে। রাজধানীর ভেতর থেকে আন্তজেলা বাসগুলোর কাউন্টার সরাতে বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ২৪ ঘণ্টায় বাস্তবায়নযোগ্য একটা কাজ। কিন্তু যে কেউ রাত ১১টায় গিয়ে কল্যাণপুর, শ্যামলী, ফকিরাপুল গিয়ে দেখতে পারেন রাস্তাকে কীভাবে কৃত্রিম টার্মিনাল বানানো হয়। এসব পুরোনো মডেলে চলার মিনি নজির।

মনে হচ্ছে, মন্ত্রণালয়গুলো প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে না। অথচ মন্ত্রণালয় পেরিয়ে পরবর্তী ধাপের দপ্তরগুলোতেও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বিএনপি নেতারা বসছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা অস্বাভাবিক নয়। বহুদিন জেল-জুলুমের শিকার হওয়া নেতাদের কোথাও কিছু ‘সুবিধা’ তো দিতে হবে।

.

প্রশ্ন হলো বিশেষায়িত এবং কারিগরি ধাঁচের প্রতিষ্ঠানগুলোয় নীতিনির্ধারণী পদে যদি বিশেষজ্ঞধর্মী ব্যক্তি না থাকেন, তাহলে এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনমুখী কোনো ভবিষ্যৎ নেই। এটা হাইটেকের যুগের মুখস্থ সত্য। সরকারি সংস্থাকে দলীয় নেতাদের পুনর্বাসনকেন্দ্র বানালে এ রকম সব সংস্থার কাজের যোগফল মিলে কী দাঁড়াবে, তা সহজে অনুমেয়।

রাষ্ট্র মানে বাংলাদেশে ৫০-৬০টি মন্ত্রণালয় এবং সেসবের অধীনে থাকা ৩০০-৪০০ দপ্তর-অধিদপ্তর। দল, প্রধানমন্ত্রী ও দেশবাসীর যাবতীয় ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন কার্যত শেষোক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা ও যোগ্যতার ওপর নির্ভর করে। নৌপরিবহন খাতে নেতৃত্ব দেবে এমন প্রতিষ্ঠানে চেয়ারম্যান নিশ্চয়ই তাঁরই হওয়া দরকার, যিনি এই বিষয়ে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। একইভাবে তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান বস্ত্রশিল্পে অভিজ্ঞ কারও নিয়োগ পেলে ভালো হয়। কেউ যুবদলের ভালো সংগঠক ছিলেন ও নির্যাতিত হয়েছেন, এটা এসব প্রতিষ্ঠানে চেয়ারম্যান হওয়ার যোগ্যতা ধরা হলে দেশের জন্য মহাবিপদ। স্বাধীনতার পর জাতীয়করণের নামে এভাবে বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সর্বনাশ হয়েছে।

.বিএনপি কি শুধু ক্ষমতার রাজনীতি দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়তে পারবে?.

সরকারি পদে দলীয় নিয়োগ পাওয়া নেতারা দলের পদ ছাড়ছেন না বলেও খবর মিলছে। এতে তাঁরা দল ও রাষ্ট্রের কাজ কোনোটিতেই মনোযোগ দিতে পারবেন না ঠিকমতো। ৪০০-৫০০ গুরুত্বপূর্ণ আমলা-সংগঠক নিয়ে শিগগিরই বিএনপি রাজনৈতিকভাবে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠতে পারে।

যে আন্দোলন ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিশ্চিত করেছে এবং বিএনপিকে ক্ষমতায় এনেছে, তার মূল দাবি ছিল রাষ্ট্রীয় নিয়োগে ‘কোটার বদলে মেধা’কে অগ্রাধিকার দেওয়া। ছয় মাসে সেই প্রত্যাশার কতটা মর্যাদা রাখা হলো, সেটা বিবেচনায় নেওয়া দরকার।

ইতিমধ্যে সরকার গুম প্রতিরোধ আইন ও মানবাধিকার কমিশন গঠনের বিষয়ে যেভাবে এগোচ্ছে, তাতেও গণ-অভ্যুত্থানের অবস্থান থেকে পিছু হটার স্পষ্ট আলামত রয়েছে। খসড়া গুম প্রতিরোধ আইনের তদন্তের প্রক্রিয়া জানিয়ে রাখছে এর কাঠামোগত দুর্বলতার বিষয়। একই রকম সংকটে থাকবে মানবাধিকার কমিশনও। এর চেয়ারম্যান ও সদস্য বাছাইয়ের প্রক্রিয়া কমিশনকে দলীয় পছন্দের গণ্ডিতে আটকে রাখার নিশ্চয়তা দিচ্ছে! আট সদস্যের বাছাই কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধি থাকছেন মাত্র একজন।

.

এভাবে তৈরি দুই আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের মানে দাঁড়াচ্ছে সংসদেও ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হবে! এ রকম দৃশ্য নাগরিক সমাজের জন্য ভয়ের। অতীতের ‘পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি’র চেয়ে এই ‘ডেমোক্রেসি’ কীভাবে আলাদা?

গুম প্রতিরোধ আইন এবং মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়াগুলো বহুল আলোচিত সংস্কারের তিক্ত ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। এসব যেন পুরোনো দিনগুলোর কাঠামোগত প্রত্যাবর্তন। টিআইবি উপরিউক্ত দুটি খসড়ার ওপর তাদের মূল্যায়ন তুলে ধরে প্রশ্ন করেছে, ‘কর্তৃত্ববাদী শাসনামলের নির্মম ও বহুমাত্রিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিজ্ঞতা থেকে সরকার আদৌ কিছু শিখেছে কি না?’

এ রকম প্রশ্ন অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের বেলায়ও প্রযোজ্য। নির্বাচিত সরকারের পুরোনো পথে হাঁটা ঠেকাতে তাদের নতুন করে সোচ্চার ও সক্রিয় হওয়া দরকার। নির্বাচিত সরকার হেরে গেলে শেষমেশ রাজনীতিই হেরে যায়।

  • আলতাফ পারভেজ গবেষক ও লেখক

    মতামত লেখকের নিজস্ব