জিডিপিতে কৃষির অবদান কমলেও দেশের প্রায় ৪৫ শতাংশ জনগোষ্ঠী এখনো জীবিকার জন্য কৃষির ওপর নির্ভরশীল। করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের সময়ও দেখা গেছে, কৃষকেরা শুধু খাদ্যনিরাপত্তায় ভূমিকা রাখছেন না; অর্থনীতিকে বড় বিপর্যয়ের হাত থেকে টিকিয়েও রাখছেন। কিন্তু কৃষি ও কৃষকদের জন্য নীতিগত সহায়তা দূরে থাকলে, তাঁদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রশ্নটি বারবার উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ আগাছানাশক প্যারাকোয়াট আমদানি ও ব্যবহার অনুমোদনের বিষয়টি সামনে আসে।
গত মে মাসে আমেরিকান সোসাইটি অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিন সাময়িকীতে ‘ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ল্যাবরেটরি প্রোফাইল অব প্যারাকোয়াট পয়জনিং: এ টক্সিকোলজিক্যাল ক্রাইসিস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটির বরাতে মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষিকাজে আগাছানাশক হিসেবে ব্যবহৃত অত্যন্ত বিষাক্ত রাসায়নিক ‘প্যারাকোয়াট’ বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, এই আগাছানাশক পানে আত্মহত্যার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
গবেষণা প্রতিবেদনটি জানায়, দেশের ১০টি হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে—২০১৩ সালে প্যারাকোয়াট পানে একজন আত্মহত্যা করেছিলেন, ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১২ জনে। এ সময়ে প্যারাকোয়াট পানে বিষক্রিয়ার ১ হাজার ৪২৯টি ঘটনা শনাক্ত করা হয়। যার মধ্যে ৪৩ শতাংশের বেশি মৃত্যু হয়। গবেষকেরা এটিকে ‘বিষবৈজ্ঞানিক সংকট’ বলে বর্ণনা করেছেন।
শুধু আত্মহত্যার ঘটনাই নয়, যারা প্যারাকায়াট ব্যবহার করছেন—সেসব কৃষকেরাও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। চিকিৎসকেরা বলছেন, স্নায়ুতন্ত্রের পারকিনসনস ডিজিজ ও বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের সঙ্গে এই বিষাক্ত রাসায়নিকটি ব্যবহারের যোগসূত্র আছে।
বাংলাদেশে একসময় শুধু চা-বাগানের আগাছানাশক হিসেবে প্যারাকোয়াট আমদানি করা হতো। দ্রুত আগাছা পরিষ্কার হয় বলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর আমদানি ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। ২০১৩ সালে যেখানে ৫৩ টন প্যারাকোয়াট আমদানি হয়েছিল, ২০২৩ সালে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৬৯৫ টনে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে যখন বিষাক্ত রাসায়নিক প্যারাকোয়াট আমদানি বাড়ছে, তখনও দেখা যাচ্ছে—এর ব্যবহার সম্পর্কে দীর্ঘদিন আগেই নিষেধাজ্ঞার নজির রয়েছে। অন্তত ১০ বছর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, দক্ষিণ কোরিয়ায় এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বর্তমানে প্রায় ৭৭টি দেশে এটির ব্যবহার নিষিদ্ধ। তবু বাংলাদেশে নীরব ঘাতক প্যারাকোয়াটের ব্যবহার বাড়ছে, সেই সঙ্গে বিষক্রিয়া ও মৃত্যু বাড়ছে।
প্যারাকোয়াটের বাইরেও উদ্বেগের জায়গা আছে। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে এখন প্রায় ২৫টি কীটনাশক, ছত্রাকনাশক, আগাছানাশক ও ইঁদুরনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে, যেগুলো জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য উচ্চ ঝুঁকির। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব রিসার্চ অ্যান্ড সায়েন্টিফিক ইনোভেশন–এ প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশে প্রায় ৩৫ শতাংশ কৃষক কীটনাশকের সংস্পর্শে এসে বমিভাব, মাথাব্যথা ও শ্বাসকষ্টের মতো তীব্র উপসর্গে ভোগেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষকদের মধ্যে ক্যানসারের প্রবণতাও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। জনস্বাস্থ্যের জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক ব্যবহারের ফলে শুধু কৃষক নয়; ভোক্তারাও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।
সেই বাস্তবতায় জনস্বাস্থ্যের জন্য নীরব ঘাতক প্যারাকোয়াট আমদানি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করার বিকল্প নেই। বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণায় বলা হয়েছে—এই রাসায়নিকের ব্যবহার বন্ধ হলে কৃষি উৎপাদনে কোনো প্রভাব পড়ে না। একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ঝুঁকিপূর্ণ সব কীটনাশকের ব্যবহার সীমিত করা বা নিষিদ্ধ করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।