শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে একটু নিরিবিলি সময় কাটাতে রাজবাড়ীর অন্তারমোড় এখন হয়ে উঠছে বিনোদনপ্রেমীদের পছন্দের জায়গা। নদীর পাড়ে বসে বাতাস উপভোগ করা, আবার ইঞ্জিনচালিত নৌকায় চড়ে পদ্মার বুকে ঘুরে বেড়ানোর টানে ছুটির দিনে ভিড় বাড়ে এখানে।
গত শুক্রবার বিকেলে অন্তারমোড় ঘাট ঘুরে দেখা যায়, নানা বয়সী মানুষের আনাগোনা। কেউ এসেছেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে, কেউ–বা বন্ধুদের সঙ্গে। কারও দেখা যায় নদীর পাড়ে বসে গল্পে মেতে থাকতে, আবার কেউ নৌকায় উঠে নদির জলরাশি আর খোলা আকাশের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন। বর্ষায় পানিতে ভরে ওঠা পদ্মার বুক থেকে বয়ে আসা বাতাসে পরিবেশটা বদলে যায় দ্রুতই। নদীর বিস্তীর্ণ জলরাশি, খোলা আকাশ আর নির্মল বাতাস উপভোগ করতে বিকেল হলেই অন্তারমোড়ে জমে ওঠে আড্ডা।
রাজবাড়ীর অন্তারমোড় রাজবাড়ী সদর উপজেলার বরাট এবং গোয়ালন্দ উপজেলার ছোট ভাকলা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত। এর একাংশ গোয়ালন্দ উপজেলায়, অন্য অংশ রাজবাড়ী সদরে। গোয়ালন্দ উপজেলা সদর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৮–৯ কিলোমিটার এবং রাজবাড়ী শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার। ব্যাটারিচালিত ও সিএনজিচালিত অটোরিকশায় সহজেই এখানে যাওয়া যায়।
বিনোদনের পাশাপাশি অন্তারমোড়ের যোগাযোগগত গুরুত্বও রয়েছে। প্রতিদিন তিন বেলা ইঞ্জিনচালিত নৌকা এখান থেকে পদ্মা পেরিয়ে গোয়ালন্দের দেবগ্রাম ইউনিয়নের বেতকা-রাখালগাছি ঘাটে যায়। রাজবাড়ী ছাড়াও পাবনা ও সিরাজগঞ্জের অনেক মানুষ এ পথে যাতায়াত করেন।
অন্তারমোড়ের পদ্মাপাড়ে মানুষের আনাগোনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে দোকানপাটও। ভাজাপোড়া, রুটি-পরোটা থেকে শুরু করে ভাত-মাছ—সবই মিলছে সেখানে। নদীতে মাছ ধরার পর জেলেদের কাছ থেকে তাজা মাছ কিনে বাড়ি ফিরছেন অনেকেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্তারমোড় পরিচিতি পেয়েছে ‘মিনি কক্সবাজার’ নামে।
নৌকায় ঘোরার আনন্দ
শুক্রবার বিকেলে আহলাদীপুরের রাজীব শেখ বন্ধুদের নিয়ে এসেছিলেন অন্তারমোড়ে। তিন বছর পর কাতার থেকে দেশে ফিরেছেন তিনি। রাজীব বলেন, ‘তিন বছর পর দেশে ফিরেছি। বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে এখানে এসেছি। পদ্মায় নৌকায় ঘুরে বেশ ভালো লাগছে।’
১৫-১৬ জন যাত্রী নিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা কিছু দূর উজানে ছুটে যায়। বিকেলের নরম আলোয় নদীর পানিতে তখন অন্য রকম আবহ তৈরি হয়। কেউ গল্প করেন, কেউ গান ধরেন। প্রায় ২০ মিনিট পর নৌকাটি আবার ঘাটে ফিরে আসে। জনপ্রতি ভাড়া দিতে হয় ৫০ টাকা।
রাজবাড়ী শহরে পরিবার নিয়ে ঘোরার মতো জায়গা খুব বেশি না থাকায় অনেকে অন্তারমোড়ে আসছেন। শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার চরে হাঁটাহাঁটি, খেলাধুলা ও বনভোজনের আয়োজনও করেন অনেকে। রাজবাড়ী জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি হেলাল মাহমুদ বলেন, ‘পদ্মার চরে পানি না থাকলে এখানে অন্য রকম পরিবেশ তৈরি হয়। অনেকে ফুটবল খেলেন, বনভোজন করেন। এ কারণে কেউ কেউ জায়গাটিকে মিনি কক্সবাজার বলেন। বর্ষায় চর ডুবে গেলেও তখন পদ্মার বিশাল জলরাশি আর বাতাস উপভোগ করা যায়। সময় পেলে আমিও এখানে ছুটে আসি।’
কোলাহল ছেড়ে পদ্মার পাড়ে
রাজবাড়ী সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী মৌটুসি আক্তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অন্তারমোড়ে এসেছিলেন। তিনি বলেন, শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে গিয়ে বর্ষার পরিবেশ উপভোগ করতে অন্তারমোড় বেশ ভালো জায়গা। পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসে তিনি অনেক ভালো সময় কেটেছেন। তবে দর্শনার্থীদের জন্য নিরাপত্তা ও বিশ্রামের ব্যবস্থা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। বিশেষ করে ঝড়–বৃষ্টির সময় আশ্রয়ের ব্যবস্থা থাকলে দর্শনার্থীদের ভোগান্তি কমবে।
মানুষের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় দোকানের সংখ্যাও বেড়েছে বলে জানান অন্তারমোড়ের দোকানি খায়রুল প্রামাণিক। তাঁর ভাষ্য, আগে নৌকার জন্য অপেক্ষা করা যাত্রীরাই এখানে বসতেন। তখন একটি-দুটি দোকান ছিল। এখন নদী পারাপারের পাশাপাশি ঘুরতে আসা মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে।
শহরের ব্যস্ততা থেকে কয়েক ঘণ্টার স্বস্তি খুঁজতে আসা মানুষের আনাগোনায় অন্তারমোড় এখন আর শুধু নদী পারাপারের ঘাট নয়। পদ্মার পাড়ের নির্মল পরিবেশ ও খোলা হাওয়ায় সময় কাটাতে এখানে ভিড় করছেন মানুষ। ফলে রাজবাড়ীর মানুষের কাছে অন্তারমোড় ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে জনপ্রিয় এক বিনোদনকেন্দ্র।