ফেসবুকে একটি পোস্ট শেয়ার করাকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফজলুল হক মুসলিম হলের এক শিক্ষার্থীকে প্রাধ্যক্ষের কক্ষে প্রায় দেড় ঘণ্টা আটকে রেখে ভয়ভীতি, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং মুঠোফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে হলের প্রাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে। অভিযোগে আরও বলা হয়, জোরপূর্বক লিখিত বক্তব্যে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
অভিযোগের বিষয়ে হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ইলিয়াস আল মামুন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অভিযোগকারী শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহীম বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবোটিকস অ্যান্ড মেকাট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। তিনি জানান, সম্প্রতি ফেসবুকে একটি পোস্ট শেয়ার করেছিলেন। এর জেরে রোববার দুপুরে হলের প্রাধ্যক্ষ ইলিয়াস আল মামুন তাঁকে নিজ কক্ষে ডেকে পাঠান। সেখানে কথা বলার এক পর্যায়ে তাঁর পকেটে থাকা মুঠোফোন বের করতে বলা হয়।
ইব্রাহীমের অভিযোগ, ফোন দিতে অস্বীকৃতি জানালে প্রাধ্যক্ষের কয়েকজন স্টাফ তাঁর কাছ থেকে জোরপূর্বক ফোনটি কেড়ে নেন। এ সময় তিনি কক্ষ থেকে বের হতে চাইলে তাঁকে বাধা দেওয়া হয় এবং দরজায় তালা আটকে দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি। ইব্রাহীম জানান, প্রায় দেড় ঘণ্টা তাঁকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়। হলের আসন বাতিল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব বাতিলের পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে সাইবার আইনে মামলা করার হুমকিও দেওয়া হয়। পরে প্রাধ্যক্ষের স্টাফদের তৈরি করা একটি লিখিত বক্তব্যে তাঁকে স্বাক্ষর দিতে বাধ্য করা হয়। ওই বক্তব্যে ‘হল সংসদের ভিপি, জিএস, এজিএসসহ অন্যদের প্ররোচনায় পড়ে তিনি প্রাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখালেখি করেছেন’—এমন কথা উল্লেখ ছিল বলে তিনি জানান।
ইব্রাহীম আরও বলেন, এরপর তাঁর মাকে ফোন করা হয়। একপর্যায়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লে প্রাধ্যক্ষ কিছুটা শান্ত হন। পরে তাঁকে পানি ও ফল দেওয়া হয় এবং ঘটনাটি কাউকে না জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। তিনি দাবি করেন, ফেসবুকে ওই পোস্ট দেওয়া শিক্ষার্থীকে না পেয়ে তাঁকেই ডেকে আনা হয়েছে বলে প্রাধ্যক্ষ তাঁকে জানিয়েছেন। এমনকি ওই শিক্ষার্থীকে খুঁজে বের করে ‘শায়েস্তা’ করার কথাও বলা হয়েছে বলে তিনি জানান।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ইলিয়াস আল মামুন বলেন, ওই শিক্ষার্থী তাঁর সম্পর্কে ‘সঠিক নয়’ এমন কিছু কথা ফেসবুকে লিখেছিলেন। তাঁর ভাষ্য, বিষয়টি নিয়ে হল সংসদের সঙ্গে কথা বলার পর তাঁকে ডেকে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। প্রাধ্যক্ষ জানান, শিক্ষার্থী কথোপকথন রেকর্ড করছিলেন বুঝতে পেরে ফোনটি বের করতে বলা হয় এবং পরে রেকর্ড করা বিষয়টি শিক্ষার্থী নিজেই মুছে দেন।
ইলিয়াস আল মামুন বলেন, শিক্ষার্থী তাঁর লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন যে হল সংসদের ভিপি, জিএস ও এজিএসের প্ররোচনায় তিনি পোস্টটি করেছিলেন। পরে তিনি শিক্ষার্থীর মাকে ফোন করে বিষয়টি জানানোর উদ্যোগ নেন। তবে শিক্ষার্থীর মা অসুস্থ জানতে পেরে তাঁকে আর এতে না জড়িয়ে বিষয়টি ‘মিটমাট হয়ে গেছে’ বলে জানানো হয়।
প্রাধ্যক্ষ দাবি করেন, তিনি শিক্ষার্থীকে বুঝিয়ে বলেছেন এবং পরে নাশতা করিয়ে তাঁকে চলে যেতে দিয়েছেন। দরজা বন্ধ করে আটকে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ঘটনাটি দিনের বেলা তাঁর কার্যালয়ে ঘটেছে এবং সেখানে হলের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন।
এ ঘটনার প্রতিবাদে হলটির প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ইলিয়াস আল মামুনের পদত্যাগের দাবিতে রাত ৯টার পর হল কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা। এ সময় ফজলুল হক মুসলিম হল সংসদের নির্বাচিত নেতা–কর্মী, ডাকসুর নেতা–কর্মী ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতারা সেখানে অংশ নেন।
হল সংসদ ও ডাকসুর পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধিদল প্রাধ্যক্ষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ দাবি করে। সাক্ষাৎ শেষে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা জানান, প্রাধ্যক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
এ সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ইলিয়াস আল মামুনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন এবং পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখার ঘোষণা দেন। রাত ১২টার পরও সেখানে আন্দোলন চলছিল।