জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬-এর খসড়াটি যদি বর্তমান আকারে সংসদে পাস হয়, তবে এই প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীন থাকার বদলে সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার।

আজ রোববার এক বিবৃতিতে অধিকার জানিয়েছে, ১০ আগস্ট মন্ত্রিসভা কর্তৃক অনুমোদিত এই খসড়া আইনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্যারিস নীতিমালার যথাযথ অনুসরণ করা হয়নি। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, "ফ্যাসিবাদী হাসিনার দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেছে। বিরোধী দলের নেতা-কর্মী, ভিন্নমতাবলম্বী ও সাধারণ নাগরিকেরা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, গণগ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হলেও তৎকালীন কমিশন এ বিষয়ে নিশ্চুপ ছিল।"

সংগঠনটির দাবি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার প্যারিস নীতিমালা অনুযায়ী একটি শক্তিশালী কমিশন গঠনের লক্ষ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করেছিল। তবে বিএনপি সরকার অধ্যাদেশটি সংসদে বিল আকারে উপস্থাপন না করায় সেটি ল্যাপসড বা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে বাতিল হয়ে যায়।

নতুন খসড়া আইনের ১৯ ধারার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অধিকার বলেছে, এই ধারা অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা এর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ কমিশন নিজ উদ্যোগে প্রথমে তদন্ত করতে পারবে না। এর ফলে অতীতের মতো তদন্ত নিরপেক্ষ না হওয়ার এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দায়মুক্তির আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করে সংগঠনটি।

সদস্য নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারি আধিপত্যের বিষয়ে অধিকারের বিবৃতিতে বলা হয়, প্যারিস নীতিমালা অনুযায়ী কমিশনের সদস্য নিয়োগে সমাজের বহুত্ববাদী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু ২০২৬ সালের খসড়া আইনে প্রস্তাবিত ৯ সদস্যের বাছাই কমিটিতে জাতীয় সংসদের স্পিকার, সরকারের দুজন মন্ত্রী, সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব রয়েছেন। এছাড়া বাকি চার সদস্যের মধ্যে দুজন রাষ্ট্রপতি এবং একজন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কর্তৃক মনোনীত হবেন। ফলে বাছাই কমিটির ৯ সদস্যের মধ্যে ৮ জনই সরকার-সংশ্লিষ্ট হবেন বলে দাবি করেছে অধিকার। একই সঙ্গে বাছাই কমিটিতে নারীর আলাদা প্রতিনিধিত্বের বিধান না থাকাকে বৈষম্যমূলক হিসেবে অভিহিত করেছে সংগঠনটি।

অধিকার মনে করে, "২০২৫ সালের অধ্যাদেশের তুলনায় নতুন খসড়ায় আনা এসব পরিবর্তন একটি স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার জন-আকাঙ্ক্ষা ও জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের চেতনার পরিপন্থী।" একই সঙ্গে এই পরিবর্তনগুলো প্যারিস নীতিমালার সঙ্গেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে তাদের দাবি।

মানবাধিকার সংগঠনটির দাবি, খসড়া আইনের এসব ত্রুটি সংশোধন করে প্যারিস নীতিমালা অনুযায়ী স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬ প্রণয়ন করা হলে কমিশন মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সরকারের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল করবে।