পেসারসুলভ আগ্রাসন বেশি নেই। শরীরী ভাষায় বরং ভদ্রতাই বেশি দেখা যায়। তবে মাঠের সীমানায় ফিল্ডিংয়ের সময় তাঁর চোখমুখে কখনও এমনভাবে থমকে থাকার চিত্র মেলে যে মনে হয়, ভাবনা যেন দূরের দিকে চলে গেছে। তখনই প্রশ্ন ওঠে—হাসান মাহমুদ কি ক্রিকেটার হতে হলো, নাকি কবিই হতে চাইছিলেন?
একজন কবির মাপ বোঝা যায় তাঁর কবিতায়। আর একজন পেসারের সক্ষমতা বুঝতে হলে শরীরী ভাষার বাইরে তাঁর বোলিংয়ের ভেতরেই খুঁজতে হয়। সে হিসাবে হাসানের পারফরম্যান্সের মর্মও উঠে আসে পরিসংখ্যানে। দেশের বাইরে টেস্টে এক ম্যাচে বাংলাদেশের সেরা বোলিং ফিগার এখন হাসানের নামে—১১১ রানে ৯ উইকেট।
এই ৯ উইকেট কোন ম্যাচে, তা সবারই জানা। ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে মেহেদী হাসান মিরাজ দেখেছেন, তাঁর গড়া রেকর্ডটি হাসান কীভাবে দখলে নিলেন! ২০২১ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হারারে টেস্টে ১৪৮ রানে ৯ উইকেটের কীর্তি এখন হাসানের ‘ডারউইন ডিজাস্টারে’র পেছনে। ডারউইন টেস্টে ফল হওয়ার পর ইংরেজি শব্দ বন্ধনীটা লিখেছে অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যমই। আর সে বিপর্যয়ের শুরুটা হয়েছিল হাসানের হাত ধরেই।
প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট নিয়ে হাসান অস্ট্রেলিয়াকে ব্যাক ফুটে ঠেলে দেন। এরপর স্বাগতিকেরা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি—সেশন ধরে ধরে পিছিয়ে পড়তে থাকে দলটি। দ্বিতীয় ইনিংসে ৩টি উইকেট নেওয়ার পর অনেকের প্রত্যাশা ছিল, টেস্টে বাংলাদেশের প্রথম পেসার হিসেবে এক ম্যাচে ১০ উইকেটের কীর্তিটাও হয়তো হাসানই গড়বেন। কিন্তু মিরাজ ৫ উইকেট নিলে এবং তাসকিন ও তাইজুল ১টি করে উইকেট নেওয়ায় প্রত্যাশার পথটা একটু থেমে যায়।
তবু ম্যাচসেরা হওয়ার বিষয়টি আটকানো যায়নি। এই ম্যাচে মিরাজ ব্যাটে-বলে দারুণ করেছেন, তানজিদের সেঞ্চুরিও আছে—তারপরও অস্ট্রেলিয়াকে শুরুতেই ব্যাক ফুটে ঠেলে দেওয়ার কারণেই সম্ভবত ম্যাচসেরার পুরস্কার হাসানের হাতেই উঠেছে। পুরস্কার হাতে নেওয়ার পর হাসানের কথায় ‘আমি’ শব্দটা প্রায়ই থাকেনি; দলের জয়ের কথাই তাঁর মুখে বেশি উচ্চারিত হয়েছে ‘আমরা’ দিয়ে।
অস্ট্রেলিয়া সফরে প্রথম টেস্ট শুরুর আগেই বাংলাদেশ দল ‘প্রতিদিন, প্রতি সেকেন্ডে’ নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে জানান এই পেসার। শুনুন তাঁর মুখেই—‘অনুশীলনে আমরা প্রতিদিন, প্রতিটি সেকেন্ডে নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আমাদের মাথায় শুধু এটিই ছিল—যা–ই ঘটুক না কেন, নিজের ওপর আস্থা রাখতে হবে ও প্রক্রিয়া মেনে চলতে হবে।’
হাসান আরও বলেন, বাংলাদেশ দল এই টেস্টের ফল নিয়ে ভাবেনি। তাঁর ভাষায়, পরিকল্পনা ছিল পাঁচ দিনই খেলা। তবে দলীয় ভাবনা শুধু উদ্দেশ্যেই সীমিত ছিল না। ‘আমাদের দলীয় পরিকল্পনা ছিল। সতীর্থ এবং কোচদের সঙ্গে বসে ভিডিও বিশ্লেষণ করে পরিকল্পনা করেছি যে আমাদের কী করা উচিত। মাঠে নেমে আমরা ঠিক সেটাই বাস্তবায়ন করেছি।’
বোলারদের প্রসঙ্গেও হাসান কৃতিত্ব ভাগ করে নেন সবার সঙ্গে—‘সব বোলারই দারুণ ধৈর্য দেখিয়েছে। তারা সঠিক প্রক্রিয়া মেনে কেবল নির্দিষ্ট লাইন ও লেংথ বজায় রেখে বোলিং করেছে, যার সুফল আমরা পেয়েছি।’
বাংলাদেশের মানুষ এই পারফরম্যান্সে কতটা খুশি—পুরস্কার বিতরণীতে অ্যাডাম গিলক্রিস্টের করা প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশি পেসার বলেন, ‘(দেশে) তারা আমার জন্য নিশ্চিতভাবেই ভীষণ খুশি। দেশে ফিরে আমার এলাকার মানুষের মুখোমুখি হলে দেখব তারা উৎসব করছে।’