প্রকৃতি ও বিজ্ঞানের বিবর্তন বরাবরই মানুষকে নতুন চিন্তার খোরাক দেয়। কম্পিউটার পর্দায় লেখা বা ছবি তৈরির পর এবার জীববিজ্ঞানের গভীরে প্রবেশ করল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)। কোডের পর্যায় থেকে জীবনের মূল উপাদান ডিএনএর নকশা তৈরি করে এক নতুন বিপ্লব ঘটিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা একটি এআই মডেলকে প্রাকৃতিক ডিএনএ গঠনের প্যাটার্ন চেনার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। ওপেনএআইয়ের প্রযুক্তিনির্ভর এই মডেলটি ব্যবহার করে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের ভাইরাল জিনোম তৈরি করা সম্ভব হয়েছে, যার মাধ্যমে এক ডজনের বেশি ব্যাকটেরিয়া-আক্রান্তকারী নতুন ভাইরাস আবিষ্কৃত হয়েছে। বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্সে প্রকাশিত এক গবেষণায় জানানো হয়েছে, ‘ইভো’ নামক একটি জেনারেটিভ মডেল ব্যবহার করে শুরু থেকে সম্পূর্ণ কার্যকর ভাইরাল জিনোমের নকশা তৈরি করা হয়েছে। লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের মতো ইভো মডেলটিকেও লাখ লাখ জিনোমের বিশাল ডিএনএ তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে এটি প্রকৃতিতে ডিএনএ বিন্যাসের বিবর্তনীয় নিয়মগুলো আয়ত্ত করে সম্পূর্ণ নতুন ভাইরাসের রেসিপি বা জিনোম সংকেত তৈরি করতে সক্ষম হয়।
ল্যাবরেটরিতে এই এআই-ডিজাইন করা ডিএনএ কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হলে দেখা যায়, গবেষণায় তৈরি ১৬টি কৃত্রিম ফাজ বা ব্যাকটেরিওফাজ সফলভাবে ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করতে পেরেছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে এগুলো ব্যাকটেরিয়ার নিজস্ব প্রাকৃতিক প্রতিরোধব্যবস্থাকেও পরাস্ত করেছে। এই নতুন ভাইরাসগুলোর সিকোয়েন্স বা গঠন প্রকৃতিতে বিদ্যমান অন্য যেকোনো ভাইরাসের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। গবেষক দল জানিয়েছেন, তাঁদের ট্রেনিং মডেলে মানুষের দেহে রোগ ছড়ায় এমন কোনো প্যাথোজেনের তথ্য যুক্ত করা হয়নি, ফলে এই ভাইরাসগুলো মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে না।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এই সাফল্যের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সুপারবাগ ধ্বংস করতে বিজ্ঞানীরা এখন প্রকৃতিতে ভাইরাস খোঁজার বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়ার জন্য কাস্টম-মেড থেরাপি বা ভাইরাস ডিজাইন করতে পারবেন। তবে এআই ব্যবহার করে বিষাক্ত জৈব অস্ত্র তৈরির আশঙ্কা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
জীবসুরক্ষা গবেষক, জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও সিনথেটিক বায়োলজিস্টরা জীববিজ্ঞানের জগতে এআইয়ের এই দ্রুত অগ্রগতি এবং সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতির অভাব নিয়ে সতর্ক করেছেন। জনস হপকিনস সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটির বায়োসিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ থমাস ইংলেসবি ও মরিটজ হাংক বলেন, স্ট্যানফোর্ডের এ গবেষণা প্রমাণ করে যে এআই এখন বিপজ্জনক জৈব অস্ত্র তৈরিতে সক্ষম। তাঁরা এ ধরনের গবেষণার ওপর কঠোর আইন প্রণয়নের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “মানুষ, প্রাণী বা কৃষি ফসলের ক্ষতি করতে পারে এমন প্যাথোজেনে এ ধরনের জেনারেটিভ প্রযুক্তি ব্যবহার নিষিদ্ধ করার দাবি তোলেন। আপনি বলতে পারেন, হে জিনোমিক ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল, আমাকে এমন একটি ইনফ্লুয়েঞ্জা জিনোম তৈরি করে দাও যা আরও দ্রুত ছড়াতে পারে অথবা আরও বেশি মারাত্মক হতে পারে।”
অন্যদিকে, ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের সিনথেটিক জিনোম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক টম এলিস মনে করেন, মানুষের ক্ষতি করতে পারে এমন জৈব অস্ত্র তৈরি করা এত সহজ হবে না। তাঁর মতে, ইভো দিয়ে তৈরি করা ভাইরাসগুলো জিনোম হিসেবে অত্যন্ত ছোট এবং তৈরি করা সবচেয়ে সহজ। জিনগত তথ্যের অ্যাকসেসে সামান্য কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করলেই বড় ধরনের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।
জৈবিক এআই সফটওয়্যারের ক্ষমতা সীমিত করা উচিত কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক চলছে। একদল মনে করেন এটি চিকিৎসা গবেষণাকে ত্বরান্বিত করবে, অন্যদল মনে করেন সঠিক সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকলে ক্ষতিকারক গোষ্ঠী এর অপব্যবহার করে নতুন জৈব হুমকি তৈরি করতে পারে। এই ঝুঁকি কমাতে এবং এআই ফ্রন্টিয়ার মডেলের সঠিক ব্যবহারের মানদণ্ড তৈরিতে ‘ফ্রন্টিয়ার মডেল ফোরাম’ নামের একটি অলাভজনক সংস্থা কাজ শুরু করেছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এই প্রযুক্তি অপেশাদার ব্যক্তিদের জন্য বিপজ্জনক প্যাথোজেন সম্পর্কে তথ্য পাওয়া সহজ করে দেবে। বিজ্ঞানীরা জানান, সাধারণ এআই চ্যাটবটকে কয়েকটি প্রশ্ন করেই মারাত্মক প্যাথোজেন তৈরি এবং তা ছড়িয়ে দেওয়ার ধাপভিত্তিক নির্দেশিকা পাওয়া সম্ভব হয়েছে।
সূত্র: ফোর্বস