পদার্থবিজ্ঞানের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ‘ডিরাক মেডেল ২০২৬’ বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে ৮ আগস্ট। পরিসংখ্যানগত মেকানিকসে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ বছর যৌথভাবে চারজন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীকে এই পদকে ভূষিত করেছে দ্য আবদুস সালাম ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল ফিজিকস (আইসিটিপি)।

আইসিটিপির দেওয়া তথ্যানুসারে, চার বিজ্ঞানীর উদ্ভাবনী গবেষণা কেবল তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের প্রচলিত গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তাঁদের পদ্ধতি স্নায়ুবিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং আর্থিক বাজারের মতো বিভিন্ন জটিল সিস্টেমের বিশ্লেষণে বিস্তৃত হয়েছে।

পুরস্কারপ্রাপ্ত চার পদার্থবিজ্ঞানী হলেন ফ্রান্সের কোলেজ দ্য ফ্রান্সের সাম্মানিক অধ্যাপক বার্নার্ড দেরিদা, ভারতের আইসিটিএস-টিআইএফআর-এর ইনসা–বিশিষ্ট অধ্যাপক দীপক ধর, ইতালির বোকোনি ইউনিভার্সিটির তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক মার্ক মেজার্দ এবং যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুজালেমের ইমেরিটাস অধ্যাপক হাইম সোম্পোলিনস্কি।

পুরস্কার প্রদান কমিটির প্রধান ও আইসিটিপির পরিচালক অতীশ ডাভোলকার জানান, "এই চারজন বিজ্ঞানীর কাজ পরিসংখ্যানগত মেকানিকসকে এমন এক শক্তিশালী কাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা পদার্থবিজ্ঞানের বাইরেও জীববিজ্ঞান, কম্পিউটার সায়েন্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ক্ষেত্রে জটিল প্রশ্নের উত্তরের খোঁজে সাহায্য করে।"

বার্নার্ড দেরিদা জটিল ও বিশৃঙ্খল সিস্টেমে সামগ্রিক আচরণের ব্যাখ্যার জন্য গাণিতিক মডেল তৈরি করেছেন। তাঁর উদ্ভাবিত র‍্যান্ডম এনার্জি মডেল প্রমাণ করে যে, অনেক উপাদান নিয়ে গঠিত কোনো সিস্টেমের আচরণ কখনো কখনো গুটিকয়েক অনুকূল বিন্যাস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। তাঁর এই কাজের প্রভাব স্পিন গ্লাস থেকে শুরু করে অপটিমাইজেশন, নিউরাল নেটওয়ার্ক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, ভারতীয় বিজ্ঞানী দীপক ধর দেখিয়েছেন কীভাবে জটিল সিস্টেমে সাধারণ মিথস্ক্রিয়া থেকেও অপ্রত্যাশিত আচরণ তৈরি হতে পারে। তাঁর অ্যাবেলিয়ান স্যান্ডপাইল মডেলের মাধ্যমে তিনি বালুস্তূপের উদাহরণ দিয়ে দেখান, কীভাবে একটি মাত্র বালুকণা যোগ করলে মাঝেমধ্যে বিশাল ধস নামতে পারে। এই তত্ত্বটি ভূকম্পন, ট্রাফিক জ্যাম এবং শেয়ারবাজারের আকস্মিক ওঠানামার মতো ঘটনা ব্যাখ্যায় ব্যবহৃত হয়।

জটিল সিস্টেমে অগণিত প্রতিদ্বন্দ্বী সম্ভাবনার কারণে তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলা বা ‘ফ্রাস্ট্রেশন’-এর কার্যপদ্ধতি ব্যাখ্যায় অবদান রেখেছেন মার্ক মেজার্দ। তিনি জর্জিয় পারিসি ও মিগুয়েল ভিরারসোর সঙ্গে মিলে উদ্ভাবন করেন ক্যাভিটি মেথড, যা কম্পিউটার সায়েন্স, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জটিল অ্যালগরিদম তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

তাত্ত্বিক ও কম্পিউটেশনাল স্নায়ুবিজ্ঞানের পথিকৃৎ হাইম সোম্পোলিনস্কি পরিসংখ্যানগত মেকানিকস ব্যবহার করে মস্তিষ্কের নিউরাল সার্কিট, স্মৃতিশক্তি এবং হপফিল্ড মডেলের সমাধান প্রকাশ করেন। তাঁর এই কাজ পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে মস্তিষ্কের মেমোরি সিস্টেমের সম্পর্ক স্থাপনে সেতু হিসেবে কাজ করেছে, যা বর্তমানে ডিপ লার্নিং ও এআই গবেষণায় প্রয়োগ করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী পল ডিরাকের স্মরণে ১৯৮৫ সাল থেকে আইসিটিপি প্রতিবছর তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে অসামান্য অবদানের জন্য এই পদক প্রদান করে আসছে। অতীতে এই পুরস্কারপ্রাপ্ত অনেক বিজ্ঞানী পরবর্তীতে নোবেল পুরস্কার এবং ফিল্ডস মেডেলের মতো সর্বোচ্চ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। এ বছরের পদক নির্বাচন কমিটিতে দুজন নোবেল বিজয়ীসহ বিশিষ্ট বিজ্ঞানীরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।