ভার্চ্যুয়াল দুনিয়ার লাইক, কমেন্ট এবং সামাজিক স্বীকৃতির টান আমাদের বাস্তব জীবনের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে—এমন ধারণা নিয়ে গবেষণা এগিয়েছে। এক গবেষণায় দেখা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও দেওয়া লাইক বা মন্তব্য একজন মানুষের ভ্রমণের গন্তব্য বদলে দিতে পারে কি না। গবেষণাটির প্রধান বাংলাদেশি গবেষক সাবরিনা রহমান। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ার্নেল স্কুল অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড ন্যাচারাল রিসোর্সেস থেকে সম্প্রতি ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
মানুষ সাধারণত ভ্রমণের ছবি বা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন পরিবার ও বন্ধুদের আপডেট জানাতে। তবে পোস্টের নিচে আসা অসংখ্য লাইক ও কমেন্টও তাদের আগ্রহ তৈরি করে। জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সব বয়সের মানুষের ভ্রমণ পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলে। সেই প্রভাবের মাত্রা মিলেনিয়াল প্রজন্মের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি। অন্যদের ট্রাভেল পোস্ট তাদের কাছে আকর্ষণীয় মনে হয় এবং নিজেদের সামাজিক মর্যাদা বাড়ানোর প্রত্যাশা সেই অনুভূতিকে আরও জোরালো করে; ফলে তারা একই জায়গায় যেতে আগ্রহী হন এবং নিজেরাও পোস্ট দিতে উৎসাহ পান। বেবি বুমার প্রজন্মের ক্ষেত্রে অন্যদের এমন পোস্ট দেখে ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম।
গবেষণার বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সাবরিনা রহমান বলেন, ‘আমরা যখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু পোস্ট করি, তখন আশা করি, আমাদের সহকর্মীরা বা পরিচিতরা ইতিবাচক সাড়া দেবেন, লাইক ও কমেন্ট করে যুক্ত হবেন। ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়ার এই প্রত্যাশাকে আমরা “সোশ্যাল রিটার্ন” বা সামাজিক প্রতিদান বলি। আমরা অজান্তেই দৈনন্দিন জীবনে এটি চর্চা করে চলি।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা সম্পর্কে সাবরিনা রহমান আরও বলেন, এটি তুলনামূলকভাবে একটি নতুন বিষয়। তবে বিশ্বের প্রায় দুই–তৃতীয়াংশ মানুষ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করার কারণে বিষয়টি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি জানান, মানুষ ভ্রমণের আগে ট্রাভেল ব্লগ, পোস্ট ও রিভিউ দেখে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো গন্তব্য সম্পর্কে কী ধরনের তথ্য ও উপস্থাপনা থাকে, সেটি সেই গন্তব্যকে মানুষের কাছে কতটা আকর্ষণীয় করে—তা ভ্রমণ পরিকল্পনার ইচ্ছা তৈরিতে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে কেমন ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যেতে পারে—সেই প্রত্যাশাও কখনো কখনো বিশেষ কোনো স্থানে যাওয়া বা নতুন রেস্তোরাঁয় খাওয়ার সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করে।
কারেন্ট ইস্যুজ ইন ট্যুরিজম সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণাপত্রে তিনটি পৃথক গবেষণা অন্তর্ভুক্ত ছিল। গবেষক দলের সদস্যরা হলেন সাবরিনা রহমান, বাইনাম বোলে ও জ্যাকারি রাসেল। জরিপে চার জন্মপ্রজন্ম—বেবি বুমার, জেন এক্স, মিলেনিয়াল ও জেন–জির—মোট দুই হাজার জনের বেশি অংশগ্রহণকারীর ওপর কাজ করা হয়। জরিপে ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো মূলধারার জনপ্রিয় স্থান থেকে শুরু করে কিউবা ও স্লোভেনিয়ার মতো তুলনামূলক কম পরিচিত গন্তব্যে ভ্রমণের পোস্টগুলো পর্যবেক্ষণ করা হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, বয়সভেদে মানুষের পছন্দের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বয়স্ক বা বেবি বুমাররা ফ্রান্সের মতো মূলধারার ঐতিহ্যবাহী জায়গার পোস্টের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হন। অন্যদিকে তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে জেন–জি, অপ্রচলিত বা আনকমন এলাকার পোস্টের প্রতি বেশি ঝুঁকছে। প্রজন্মগত এই পার্থক্যের প্রসঙ্গে সাবরিনা রহমান জানান, জেন–জি কোনো ধারা বা প্রবাহের সঙ্গে ভেসে যায় না। তারা সর্বদা নতুনত্ব বা রোমাঞ্চ খোঁজে। চিরাচরিত বা গতানুগতিক গন্তব্য সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্ট তাদের ভ্রমণের পরিকল্পনা খুব একটা পরিবর্তন করতে পারবে না।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কেবল অনুপ্রেরণা বা ভ্রমণ টিপস দেওয়ার মাধ্যম নয়; মানুষ কোথায় ঘুরতে যাবে, সেটিও নির্ধারণ করে দিতে পারে।
সূত্র: ফিজ ডট অর্গ