নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর উপজেলার গুড়িহারী শালবাড়ি গ্রামের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে শিক্ষার আলো এখনো পুরোপুরি পৌঁছায়নি, সেই প্রতিকূল পরিবেশ জয় করে এসএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন নুসরাত জাহান। অশিক্ষা ও কুসংস্কারে ঘেরা সমাজের শেষ প্রান্তে বাঁশঝাড়ে ঘেরা একটি মাটির ঘরে বেড়ে ওঠা নুসরাতের এই সাফল্য পুরো গ্রাম ও বিদ্যালয়ের জন্য বয়ে এনেছে অনাবিল আনন্দ।
ফলাফল প্রকাশের দিন আলোর পাঠশালার শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক যখন উত্তেজনার সাথে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে রেজাল্ট দেখার চেষ্টা করছিলেন, ঠিক তখনই সকাল ১০:৩৫ মিনিটে প্রধান শিক্ষকের ফোনে কল করেন নুসরাতের বাবা নাদের আলী মাস্টার। তিনি অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানান যে, নুসরাত জাহান জিপিএ ৫ পেয়েছে। নুসরাত সকালেই তার বাবার মুঠোফোনে রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে এসএমএস পাঠিয়ে রেখেছিল, যার ফলে তার ফোনে ফলাফল আগে চলে আসে। এই খবরে পুরো বিদ্যালয় ও গ্রাম উৎসবে মেতে ওঠে।
নুসরাতের পারিবারিক জীবন ছিল চরম দারিদ্র্য ও সংগ্রামের। তার বাবা নাদের আলী মাস্টার একজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। সামান্য জমি-জিরাত না থাকায় এবং দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর ধরে দুরারোগ্য ব্যাধির কারণে প্রতি মাসে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে চিকিৎসার প্রয়োজন হওয়ায় তিনি আর্থিক সংকটে ভুগেছেন। একমাত্র চাকরির আয়ে সংসার চালানো, দুই মেয়ের পড়াশোনা এবং নিজের চিকিৎসার খরচ মেটাতে তিনি হিমশিম খেয়েছেন। এই অভাবী সংসারে কিছুটা সহায়তা করতে নুসরাতের মা সালমা বেগম হাঁস-মুরগি পালন করেন।
শৈশব থেকেই পড়াশোনায় মেধাবী নুসরাত প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতি বছর শ্রেণি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেছে। বৃষ্টির দিনে কাদা পানির মধ্য দিয়ে স্কুলে আসা এবং রাত জেগে পড়াশোনা করার অদম্য ইচ্ছা তাকে এই সাফল্যে পৌঁছে দিয়েছে। পড়াশোনার সময় তার মা পাশে বসে হাতপাখায় বাতাস করে তাকে সাহস জুগিয়েছেন। এমনকি উচ্চ মাধ্যমিকের বই কেনার খরচ জোগাতে এসএসসির পর থেকে সে প্রাইভেট পড়ানো শুরু করে। নুসরাতের মা জানান, "স্কুল ছুটির পর অন্য শিক্ষার্থীরা যখন খেলাধুলা করত নুসরাত তখন বসে বসে বিশ্ব সাহিত্যের বই পড়তো।"
ভবিষ্যতে ডাক্তার হয়ে নিজের গ্রাম গুড়িহারীতে একটি ছোট হাসপাতাল গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন নুসরাত। সেখানে দরিদ্র মানুষ যেন বিনা পয়সায় চিকিৎসা পায়, সেই লক্ষ্যেই সে কঠোর পরিশ্রম করে এগিয়ে চলেছে। তার এই অর্জন প্রমাণ করে যে, সে কেবল নাদের আলী মাস্টারের সুযোগ্য কন্যাই নয়, বরং আলোর পাঠশালার প্রকৃত আলো, যার কাজ অন্ধকার দূর করা।