সেদিন ঢাকার আকাশে রংধনু উঠেছিল। আমার কাজের জায়গা থেকে খোলা আকাশ দেখা যায়—রেলগাড়ি, এক্সপ্রেস ওয়ে, দূরের দালানকোঠা ছাপিয়ে প্রতিদিনই আকাশের দিকে তাকানোর সুযোগ হয়। কিন্তু সেদিনের আকাশটা ছিল অন্য রকম। বারবার রং বদলাচ্ছিল—কখনো শ্রাবণের মেঘ জড়ো হলো আকাশে, কখনো মেঘের কোলে রোদ হেসেছে। আবার কখনো নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভেসে উঠেছে, যেন রীতিমতো স্লাইড শো।
আমাদের সহকর্মীর ছোট্ট কন্যা আনালিয়া। বাবার সঙ্গে প্রায়ই অফিসে আসে। তার সরলতা আর মিষ্টি ব্যবহার আমাদের এতটাই টানে যে সে না এলে আমরা উল্টোই জিজ্ঞেস করতে থাকি—আনালিয়া কই? দেখি না যে অনেক দিন?
আনালিয়া একই সঙ্গে প্রশাসন এবং মানবসম্পদের হয়েও কাজ করে। বিভিন্ন ডেস্কে গিয়ে বলে, ‘তোমার কাজ নাই? কথা বলছ কেন? তোমাদের টিচার বকে না?’
তো সেদিন আনালিয়া এল আমার কাছে। কাচের জানালা দিয়ে রংধনু আর মেঘ দেখছিল। হঠাৎ মেঘের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এই মেঘগুলো কোথায় যাবে?’ আমি বললাম, ‘দূরে, অন্য কোনো দেশে।’ আনালিয়া তখন গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, ‘হায় হায়, তখন তো ওই দেশে বৃষ্টি হবে, ওরা ভিজে যাবে, ওদের তো কষ্ট হবে।’
কী জানি কেন—অচেনা একটি শিশুর ওই ছোট্ট চিন্তাটা আমাকে গভীরভাবে নাড়ল। চেনে না, জানে না—তবু অচেনা মানুষের জন্য মায়া জন্মায় কীভাবে? আর বাস্তব জীবনে আমরা যেন নিষ্ঠুরতার খেলায় মেতে উঠেছি!
মানুষ মূলত একা। এ কথাটা ইদানীং আরও সত্য হয়ে উঠেছে। কাছের মানুষ, আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। একটা স্ট্যাটাস, একটা শেয়ার ইতি টেনে দেয় বন্ধুত্বের। পাশাপাশি চলছি, পাশাপাশি কাজ করছি কিন্তু অন্তরে অন্তরে বাড়ছে অবিশ্বাস, ব্যবধান।
ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিনই চোখে পড়ে—গাড়ির সঙ্গে গাড়ি, গাড়ির সঙ্গে বাস, মোটরসাইকেলের সঙ্গে সিএনজি ঘর্ষণ। ধাক্কা লেগেই আছে; এরপর উভয় পক্ষের তর্কাতর্কি, হাতাহাতি। রাজপথের দৃশ্যটা আমাদের এতটাই অভ্যাস হয়ে গেছে যে ‘আমারে চিনস?’—এই কথাগুলোও যেন স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে।
সেদিন সন্ধ্যায় কারওয়ান বাজারে দেখলাম, পাঁচ–ছয়জন মিলে বাঁশ দিয়ে মাটিতে ফেলে একজনকে পেটাচ্ছে। শ খানেক মানুষ দাঁড়িয়ে তা উপভোগ করছে আর যার যার মোবাইলে ভিডিও করছে। আশপাশ থেকে নানা মন্তব্য—চুরি করছে মনে হয়, অমুকের বাচ্চা…মাইরা ফ্যালা…। বিচার দাবির কথা শোনা যায়, কিন্তু নিষ্ঠুরতা উপভোগ করা, অকথ্য গালি দেওয়া—এগুলো এখন আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের মতোই হয়ে উঠেছে কি না, ভাবতে বাধ্য করে।
ধর্ষণ, খুনের খবর সংবাদপত্রে আগেও ছাপা হয়েছে। তবে দিনে দিনে যেন তা মেনে নিতে নিতে ‘নারকোটিক ডিসফাংশন’ পর্যায়ে চলে গেছে। সেই কবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে সড়ক দুর্ঘটনায় এক পরিবারের মারা গিয়েছিল ছয়জন। সেই ছয়জনের মধ্যে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের মেধাবী ছাত্রী আমাদের বন্ধু তাজিন আহমেদ, তাঁর মা সরকারের সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা নাজমা আহমেদ। খবরটা তখন সংবাদপত্রে প্রথম পাতায় লিড হয়েছিল। এখন পরিবারের পর পরিবার শেষ হয়ে যায় সড়ক দুর্ঘটনায়—আমরা আহা–উঁহু করারও সময় পাই না!
সমাজ কি এতটাই নির্মম, নাকি কেবল তার মুখোশ খুলে যাচ্ছে?
মানুষ মূলত একা। এ কথাটা ইদানীং আরও সত্য হয়ে উঠেছে। কাছের মানুষ, আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। একটি স্ট্যাটাস, একটি শেয়ার ইতি টেনে দেয় বন্ধুত্বের। পাশাপাশি চলছি, পাশাপাশি কাজ করছি—কিন্তু অন্তরে অন্তরে বাড়ছে অবিশ্বাস, ব্যবধান। দেশের রাজনীতির পরিবর্তন, ক্ষমতা বদল, প্রতিবাদ–প্রতিরোধ, সন্ত্রাস, প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মের ব্যবধান—অল্প সময়ে অনেক কিছুই আমাদের চোখে পড়েছে।
তবে ব্যক্তি পর্যায়ে অবিশ্বাস এখন ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। সন্দেহ এখন মনে মনে বাসা বাঁধে। আনন্দও যেন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে ষড়যন্ত্রের গন্ধে। তবু দূর থেকে দেশপ্রেম দেখানোর মতো সহজ কিছুই তো নয়; এই সমাজে যারা বসবাস করি, আমাদের আর উপায় কী?
কী জানি, কেন শঙ্খ ঘোষের সেই কবিতাটা বারবার মনে পড়ে— ‘কিছুই কোথাও যদি নেই/ তবুতো কজন আছি বাকি/ আয় আরো হাতে হাত রেখে/ আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি।’
ছোট্ট আনালিয়াকে দেখে ইদানীং আমার একটা কথা প্রায়ই মনে হয়—আহা, যদি আনালিয়া হতাম!
সুমনা শারমীন মুক্তকণ্ঠর সহযোগী সম্পাদক