৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৬৪ শতাংশের মতো। গত দুই দশকের মধ্যে এত কম পাসের হার আগে দেখা যায়নি। ২০০৭ সালের পর থেকেই পাসের হার তুলনামূলকভাবে বেশি থাকলেও তা ধীরে ধীরে ঊর্ধ্বমুখী ছিল।

তবে গত বছর থেকে চিত্র বদলাতে শুরু করে। ২০২৫ সালে গড় পাসের হার ছিল ৬৮ শতাংশের সামান্য ওপরে; অথচ ২০২৪ সালে তা ছিল ৮৪ শতাংশের কাছাকাছি। এর আগে বহু বছর পাসের হার ৮০ শতাংশের ওপরে বা আশপাশে ছিল, এমনকি কোনো কোনো বছর তা ৯০ শতাংশও ছাড়িয়েছে।

এ বছরের ফলাফলে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে। ২০২৪ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৬৩ হাজার ৮৪৫ জন শিক্ষার্থী, ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ১৮; আর এ বছর ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন। একই সঙ্গে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি—এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৪ সালে পাস করতে না পারা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৫১টি, ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয় ১৩৪টি; আর এ বছর এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩১২।

আরেকটি বিষয় নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, পাস করা শিক্ষার্থীদের অন্তত অর্ধেক জিপিএ–৩-এর নিচে পেয়েছে। শিক্ষা বোর্ড–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, জিপিএ–২ থেকে ৩ কিংবা ন্যূনতম জিপিএ নিয়ে যারা পাস করেছে, তাদের বড় অংশ গ্রামের। এর মধ্যে দরিদ্র এলাকায় এমন ফল বেশি বলে তাঁদের দাবি এবং এ বিষয়ে আরও বিশ্লেষণের পক্ষে মত দিয়েছেন।

দরিদ্র পরিবারের অধিকাংশ শিক্ষার্থী আলাদা করে কোচিং বা প্রাইভেট পড়ার সুযোগ পায় না। প্রায় ক্ষেত্রেই ভালো শিক্ষক কিংবা উপযুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও তাদের ভাগ্যে জোটে না। এ অবস্থায় দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম শিক্ষাজীবনকে বারবার ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অতীতের ফলাফলেও গ্রাম-শহরের শিক্ষাবৈষম্য দৃশ্যমান ছিল; কিন্তু তা কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ঘাটতি রয়ে গেছে।

বিভাগভিত্তিক ফলাফলেও ব্যবধান বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। মানবিক বিভাগের পাসের হার সবচেয়ে কম, ৪৯ শতাংশের নিচে। বিপরীতে বিজ্ঞান বিভাগের পাসের হার ৮০ শতাংশের ওপরে। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ফলও মানবিকের তুলনায় ভালো, গড়ে ৬৫ শতাংশের কাছাকাছি। মানবিক বিভাগে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় সামগ্রিক পাসের হারে এর প্রভাব পড়েছে। স্কুলগুলোতে দেখা যায়, মানবিক বিভাগে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে দুর্বল শিক্ষার্থীদের ভর্তি করানো হয়—এ প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই চলমান।

মজার ব্যাপার হলো, শিক্ষা বোর্ডের হাতে পাসের হার বাড়ানোর চাবিকাঠি কী—তার ইঙ্গিত বিভিন্ন সময়েই পাওয়া গেছে। যেমন গত বছর ফল প্রকাশের পর আন্তশিক্ষা বোর্ডের সভাপতি সাংবাদিকদের কাছে বলেছিলেন, ‘আমাদের কোনো টার্গেট ছিল না যে পাসের হার এত করব, বাড়াব, নাকি কমাব।’ পত্রিকার সংবাদেও বলা হয়েছিল, উত্তরপত্র মূল্যায়নে অন্যান্য বছরের চেয়ে ‘কড়াকড়ি’ ছিল। এ বছর ফল প্রকাশের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা বলেছেন, এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার উত্তরপত্র ‘নির্মোহভাবে’ মূল্যায়ন করা হয়েছে।

এক বছরের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আগের-পরের বছরের শিক্ষার্থীদের ব্যবধান তৈরি হচ্ছে এইভাবে। কিন্তু বাস্তবে তারা সবাই পরে চাকরির বাজারে একসঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। ফলে কোনো বছরে খাতা মূল্যায়নে সরকারের বিশেষ নির্দেশনা থাকা বা না থাকা—দেখতে যতই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত মনে হোক না কেন—তা বাস্তব ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বাড়তি লাভ-ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং ভবিষ্যতে তাদের অসম প্রতিযোগিতায় ফেলে দিতে পারে।

বর্তমান অবস্থায় আশঙ্কা করা হচ্ছে, উচ্চমাধ্যমিক কলেজগুলোয় আসন খালি পড়ে থাকবে সাড়ে ১৩ লাখের বেশি। আবার একই সঙ্গে এটাও সত্য, ‘ভালো’ কলেজগুলোতে ভর্তির জন্য আগের মতোই চাপ থাকবে। কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভালো, কোনটি মন্দ, এটা মোটাদাগে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল দিয়েই বিবেচনা করা হয়।

খাতা দেখার ক্ষেত্রেও শিক্ষকদের দায়িত্বহীনতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সংবাদমাধ্যমে প্রতিবছরই খাতা দেখার বিষয়ে অনিয়ম ও গাফিলতির খবর আসে। চায়ের দোকানে বসে বা শিক্ষার্থীদের সহায়তা নিয়ে খাতা দেখার মতো ঘটনা কয়েক দিন আগে পত্রিকায় ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসেছে। এ ধরনের শিক্ষককে শাস্তির আওতায় আনা ছাড়া বিকল্প দেখা যায় না। একই সঙ্গে নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা না থাকায় শিক্ষকভেদে নম্বরের পার্থক্যও হয়ে থাকে। এই সমস্যার সমাধানে একাধিক পরীক্ষক দিয়ে খাতা মূল্যায়নের প্রস্তাবও আসে।

এ বছর এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কপালও খারাপ বলা যায়। করোনা মহামারির সময়ে, যখন স্কুল কার্যত বন্ধ ছিল, তারা পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়েছে। অর্থাৎ প্রাথমিকের চূড়ান্ত পর্ব এবং মাধ্যমিকের সূচনার গুরুত্বপূর্ণ দুই বছর তাদের সরাসরি পাঠবঞ্চিত থাকার ঝুঁকিতে পড়তে হয়েছে। ফলে শিখনঘাটতি বেশি থাকা স্বাভাবিক। উপরন্তু নবম শ্রেণিতে ওঠার পর এই শিক্ষার্থীদের হাতে হঠাৎ করে সম্পূর্ণ নতুন শিক্ষাক্রমের বই তুলে দেওয়া হয়েছিল। পরে সেই বই সরিয়ে নিয়ে দশম শ্রেণিতে আবার আগের শিক্ষাক্রমের বই তুলে দেওয়া হয়। পরীক্ষার জন্য সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করেও ধস ঠেকানো যায়নি।

এ অবস্থায় আশঙ্কা করা হচ্ছে, উচ্চমাধ্যমিক কলেজগুলোয় আসন খালি পড়ে থাকবে সাড়ে ১৩ লাখের বেশি। একই সঙ্গে এটাও সত্য, ‘ভালো’ কলেজগুলোতে ভর্তির জন্য আগের মতোই চাপ থাকবে। কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভালো, কোনটি মন্দ—মোটাদাগে তা পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল দেখেই নির্ধারিত হয়।

তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ ও পরিকল্পনার মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মানের ব্যবধান অনেকখানি কমানো সম্ভব। স্কুল-কলেজে নিয়মিত বিরতিতে পাঠদান ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিষয় তদারকির আওতায় আনতে হবে। শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষকদের কোচিং বা প্রাইভেট কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগে যাতে অনিয়ম না হয়, সে বিষয়ে কড়া নজরদারি প্রয়োজন।

শিক্ষার্থীদের প্রকৃত দক্ষতা কেবল জিপিএ দিয়ে মাপা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই মূল্যায়নের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনার কথা ভাবতে হবে। এখন পর্যন্ত স্কুলগুলোয় নম্বরের ভিত্তিতেই শিক্ষার্থীর মান নির্ধারণ করা হয় এবং পরে তাকে পরবর্তী শ্রেণিতে উন্নীত করা হয়। কিন্তু ওই শ্রেণির জন্য নির্ধারিত যোগ্যতা সে হয়তো যথেষ্ট মাত্রায় অর্জনই করেনি—এমন আশঙ্কা থেকেই যায়। প্রতিটি বিষয়ের জন্যই নির্দিষ্ট যোগ্যতা নির্ধারিত থাকে। কোনো বিষয়ে ঘাটতি থাকলে তা পরবর্তী শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর পাঠ গ্রহণে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

এ কারণে স্কুলগুলোর পরীক্ষার রেজাল্ট শিটে বা মূল্যায়নপত্রে গতানুগতিক জিপিএ বা নম্বরের পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা-সবলতার স্পষ্ট বিবরণ থাকা দরকার। একই সঙ্গে এসব দুর্বলতা বা শিখনঘাটতি দূর করার জন্য বাড়তি ক্লাস ও পরীক্ষার আয়োজন করতে হবে।

শুধু পড়াশোনা নয়, শিক্ষাকে আনন্দদায়ক ও বহুমুখী করার জন্য বর্তমান সরকারের নানা রকম উদ্যোগের কথাও শোনা যাচ্ছে। প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’ বিষয়ে দুটি আলাদা পাঠ্যপুস্তক যুক্ত হচ্ছে। তৃতীয় ভাষা শেখা ও কারিগরি দক্ষতা অর্জনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসবের পাশাপাশি একটি বিষয় বিবেচনায় রাখা দরকার: সব শিক্ষার্থী সব বিষয়ে সমান দক্ষ হয় না, আগ্রহের ক্ষেত্রও এক রকম থাকে না। মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও এটি বিবেচনায় আনা উচিত। সৃজনশীল ও অতিরিক্ত দক্ষতা রেজাল্ট কার্ডে উল্লেখ থাকতে পারে।

পাসের হার বেড়েছে বা জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেই শিক্ষার মান বাড়বে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। বরং শিক্ষার্থীর ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মনোযোগ বাড়াতে হবে। সামগ্রিক শিক্ষার মান উন্নয়নে আন্তর্জাতিক শিক্ষাপদ্ধতির সঙ্গে মিল রেখে শিক্ষাক্রম, পাঠদানপ্রক্রিয়া ও মূল্যায়নপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার উদ্যোগও জরুরি। দারিদ্র্যের কারণে কোনো শিক্ষার্থী যাতে বৈষম্যের শিকার না হয়, তার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

  • তারিক মনজুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

    মতামত লেখকের নিজস্ব