পৃথিবীর বরফাবৃত শীতল অঞ্চলগুলো বর্তমানে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতির তৈরি বরফের নদীগুলো নিঃশব্দে গলে মহাসাগরে পানির পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে মানবজাতির জন্য বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সংকেত দিচ্ছে। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, অ্যান্টার্কটিকার থওয়েটস হিমবাহ, যা 'ডুমসডে গ্লেসিয়ার' নামে পরিচিত, তা ধসে পড়লে সমুদ্রের পানির উচ্চতা ১০ ফুট পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
এর ফলে যুক্তরাজ্যের হাল, পিটারবরো, পোর্টসমাউথ এবং পূর্ব লন্ডনের মতো নিচু এলাকাগুলো তলিয়ে যাওয়ার তীব্র ঝুঁকি তৈরি হবে। শুধু ইউরোপ নয়, বাংলাদেশ, মালদ্বীপ এবং সাংহাইয়ের মতো নিচু উপকূলীয় অঞ্চলগুলোও এই হিমবাহ গলে যাওয়ার সরাসরি প্রভাবে প্লাবিত হওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার বিশাল বরফের স্তর বাদে বিশ্বের অন্যান্য হিমবাহে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ঘনকিলোমিটার বরফ জমে আছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে যে, বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে আল্পস, আন্দিজ এবং হিমালয় পর্বতমালার বরফ দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। উষ্ণ বাতাসের প্রভাবে বরফ গলনের হার এতটাই বেশি যে, তুষারপাতের মাধ্যমে তা আর পূরণ হচ্ছে না। গবেষকদের মতে, গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার হিমবাহগুলো পুরোপুরি গলে গেলে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১২ ইঞ্চির বেশি বৃদ্ধি পাবে।
ভেনিসের কা ফোসকারি ইউনিভার্সিটির গবেষক নিকোলো মাফেজোলি এই পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, ‘আমাদের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। আল্পস পর্বতমালাসহ মধ্য অক্ষাংশের হিমবাহগুলো আগামী কয়েক দশকের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।’
বরফের পরিমাণ নিখুঁতভাবে পরিমাপ করতে গবেষকেরা 'আইসবুস্ট ২.০' নামে একটি এআই মডেল তৈরি করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন হিমবাহের তথ্যের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত এই মডেলটি সায়েন্টিফিক ডেটা সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। জানা গেছে, আগের পদ্ধতির তুলনায় এই মডেলটি ৪০ শতাংশ বেশি নির্ভুলভাবে বরফের পরিমাণ জানাতে সক্ষম।
এদিকে যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অফিস এবং ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ধারণা, আগামী শতাব্দীতে সমুদ্রের পানির স্তর ক্রমাগত বৃদ্ধি পাবে। ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম্যাট পামার বলেন, ‘সমুদ্র এবং বরফাবৃত অঞ্চলগুলো বৈশ্বিক উষ্ণায়নে খুব ধীরে প্রতিক্রিয়া জানায়। এই কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি জলবায়ু পরিবর্তনের একটি সুপ্ত দানব হিসেবে কাজ করছে।’
অধ্যাপক পামারের মতে, আগামী শতাব্দীগুলোতে সমুদ্রের পানি বৃদ্ধি পাওয়া একপ্রকার নিশ্চিত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯৯ সাল থেকে বিশ্বে প্রতিবছর গড়ে ৩.৬৪ মিলিমিটার করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়েছে। তবে ২০১২ সালের পর স্যাটেলাইট তথ্যে দেখা গেছে, এই বৃদ্ধির হার আরও বেড়ে প্রতিবছর ৪.১ মিলিমিটারে পৌঁছেছে।