খুলনার রূপসা উপজেলার বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন সড়কে ভারী যান চলাচলের চাপ আর দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে সড়কটি এখন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। কোথাও পিচের চিহ্ন নেই বললেই চলে, কোথাও মাটি বেরিয়ে এসেছে। বৃষ্টির পানি জমে গর্তগুলোতে তৈরি হচ্ছে কাদা। গর্ত এড়িয়ে চলারও উপায় নেই—একটার পর একটা গর্ত সড়কজুড়ে। কোথাও কোথাও ভাঙা অংশ এতটাই গভীর যে ভ্যান বা অটোরিকশা নিয়ে এগোনো কঠিন হয়ে পড়ে; তখন মাঝপথে যাত্রীদের নেমে যেতে হয়।
সড়কের এই অবস্থা বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন ও বীর বিক্রম মহিবুল্লাহর সমাধি কমপ্লেক্সের পাশে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সড়কটির ওপর দিয়ে স্বাভাবিকভাবে যানবাহন চলাচল করা যাচ্ছে না। বর্ষায় দুর্ভোগ আরও বাড়ছে—স্থানীয় বাসিন্দা, বিভিন্ন শিল্প–কারখানার শ্রমিক এবং পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত লোকজনকে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে বলা হয়, প্রতিদিন অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ এ সড়ক দিয়ে চলাচল করেন।
প্রায় সাত কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি শুরু হয় রূপসা ফেরিঘাটের পূর্ব পার থেকে। এরপর চর রূপসা, বাগমারা হয়ে জাবুসা বাজার পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে। সড়কটির প্রায় তিন কিলোমিটার অংশ এখনো কাঁচা। অন্যদিকে ওরিয়ন পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে রূপসা সেতুর নিচ দিয়ে রূপসা ফেরিঘাট পর্যন্ত চার কিলোমিটার পাকা অংশ বর্তমানে বেশি গুরুত্ব পায় এবং সেটিও বেহাল অবস্থায় রয়েছে। ২০১৭ সালে এ অংশে সামান্য কিছু সংস্কার করা হলেও এরপর আর কোনো সংস্কারকাজ হয়নি।
আমাগো কষ্টের শেষ নাই। ঠেইলে-গুতাইয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলিও মাঝখানে যাত্রীদের নাইমে যাইতি হয়।আবু হানিফ, স্থানীয় ভ্যানচালক
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে সড়কটি কাগজপত্রে ‘গ্রামীণ সড়ক-এ’ শ্রেণির। প্রায় দুই যুগ আগে সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছিল বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান। বর্তমানে সড়কের দুই পাশে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অসংখ্য শিল্প–কারখানা। এর ফলে ভারী যানবাহনের চলাচলও বাড়ায় সড়কের ক্ষতি আরও দ্রুত হয়েছে। সার, বালু, পাথর ও কয়লাবোঝাই ১০ চাকার ট্রাকসহ বিভিন্ন ভারী যানবাহনের নিয়মিত চলাচলে সড়কটি ক্ষতবিক্ষত হয়েছে।
সড়কটি কাগজে ‘গ্রামীণ’ হলেও বাস্তবে তা শিল্পাঞ্চলের সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সড়কের দুই পাশে চিংড়ি হিমায়িত ও প্রক্রিয়াজাত করার অন্তত ১৭টি কারখানা, বরফকল, অসংখ্য মাছের ডিপো, তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কোস্টগার্ড ক্যাম্প, পুলিশ ক্যাম্পসহ গুরুত্বপূর্ণ নানা স্থাপনা রয়েছে। চর রূপসা, বাগমারা ও জাবুসা এলাকার মানুষও যাতায়াতের জন্য এই সড়ক ব্যবহার করেন। স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অন্তত তিন হাজার শ্রমিক এ সড়কে যাতায়াত করেন।
গত রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, ভাঙাচোরা সড়কের বেশির ভাগ জায়গায় পিচের চিহ্ন নেই। কোথাও খোয়া উঠে গেছে। প্রথম দেখায় কোনো কোনো অংশকে কাঁচা রাস্তা বলে মনে হতে পারে। নানা জায়গায় জমে আছে কাদাপানি। ভাঙাচোরা অংশ দিয়ে বালু, পাথর, সারসহ বিভিন্ন পণ্য বোঝাই ট্রাক ও ডাম্পার চলাচল করছে। পূর্ব রূপসার বাগমারা এলাকায় গেলে সড়ক বেহাল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অন্তত তিনজন। তাঁদের অভিযোগ, বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি সংস্কারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তৎপরতা নেই।
এলজিইডির নীতিমালা অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ২০ টন ভার বহনের উপযোগী সড়ক নির্মাণ করা যায়। কিন্তু শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এই সড়কে ৫০ টন পর্যন্ত ভারী যান চলাচল করে। ফলে সড়কটি এলজিইডির কোনো শ্রেণির মধ্যে পড়ে না।
স্থানীয় বাসিন্দা আল মাহমুদ বলেন, মাঝে মাঝে স্থানীয় লোকজন নিজ উদ্যোগে সড়কের কিছু কিছু সংস্কার করেন। তবে এখন কোথাও কোথাও খালের মতো গর্ত হয়ে গেছে বলে তাঁর বক্তব্য; দেখে মনে হয় সেখানে মাছ চাষ করা যাবে। তিনি বলেন, তাঁরা এই দুর্ভোগের অবসান চান। ভ্যানচালক আবু হানিফ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমাগো কষ্টের শেষ নাই। ঠেইলে-গুতাইয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলিও মাঝখানে যাত্রীদের নাইমে যাইতি হয়।’
এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, ভারী যানবাহনের অতিরিক্ত চাপেই সড়কটি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন ছোট–খাটো সংস্কার করে এর স্থায়ী সমাধান হবে না—এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে। ধারণক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে আরসিসি রাস্তা নির্মাণ করা প্রয়োজন বলে সূত্র জানায়। এলজিইডির নীতিমালা অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ২০ টন ভার বহনের উপযোগী সড়ক নির্মাণ করা যায়; কিন্তু শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এই সড়কে ৫০ টন পর্যন্ত ভারী যান চলাচল করে। ফলে সড়কটি এলজিইডির প্রচলিত কোনো শ্রেণির মধ্যে পড়ে না। একটি সূত্র বলছে, সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি এলজিইডিও জানে। তবে এত বেশি ব্যয়ের বিধান এলজিইডির প্রচলিত নীতিমালায় নেই।
গত জুন মাসে সড়কটির প্রায় চার কিলোমিটার সংস্কারের জন্য একটি প্রকল্পের আওতায় সাড়ে ৯ কোটি টাকার প্রাক্কলন তৈরি করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেটি ফেরত এসেছে। রূপসা উপজেলা প্রকৌশলী মো. নাজমুল হুদা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ভালোভাবে সড়কটি সংস্কার করতে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা খরচ হবে। অথচ এলজিইডির ওই প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটারে সর্বোচ্চ ৯০ লাখ টাকা ব্যয় করা যায়। এ কারণে প্রাক্কলনটি ফেরত এসেছে। তিনি জানান, তবে বিশেষ বরাদ্দ ছাড়া সড়কটির সংস্কার করা সম্ভব নয়।