ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পাঁচ মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। তবু সংঘাত অবসানের কোনো চুক্তির আশা এখনো ঘোলাটে। চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁদের কোনো সরাসরি আলোচনা হচ্ছে না।

একদিকে তেহরান থেকে প্রতিশোধের হুমকি শোনা যাচ্ছে, অন্যদিকে পশ্চিমা—বিশেষ করে ডানপন্থী—অনেক বিশ্লেষক বলছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইরানের কঠোর মতাদর্শের কারণে সমঝোতায় আসা সম্ভব নয়। তবে এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। ইরানের সংবিধান ও সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইসলামি প্রজাতন্ত্র শুধু অন্ধ মতাদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। বর্তমান শাসনকাঠামো যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তি করতে পিছপা হবে না—যদি তাতে তাদের মূল নীতি, অর্থাৎ ‘শাসনের টিকে থাকা’ নিশ্চিত থাকে।

১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনি এক বড় ঘোষণা দেন। তিনি জানান, নামাজ, রোজা ও হজের চেয়েও ইসলামি সরকারের অবস্থান ও গুরুত্ব ওপরে। এর মাধ্যমে তিনি ‘ভেলায়েতে ফকিহ’–সংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ বিতর্কের অবসান ঘটান। পরের মাসে তিনি একটি নতুন প্রশাসনিক সংস্থা গঠনের নির্দেশ দেন। এর কাজ ছিল পার্লামেন্ট ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের অচলাবস্থা দূর করে ব্যবস্থার মূল স্বার্থ রক্ষা করা।

১৯৮৯ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এই নীতি ১১২ অনুচ্ছেদ হিসেবে স্থায়ী রূপ পায়। গঠিত হয় ‘এক্সপিডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিল’। মূল বার্তা এখানে একেবারেই স্পষ্ট—শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা বা ‘হেফজে নেজাম’ হলো সবচেয়ে বড় ধর্মীয় দায়িত্ব। এ ব্যবস্থার প্রয়োজনে যেকোনো ধর্মীয় বিধান থেকে সরে আসার আইনি ক্ষমতা ওই পরিষদকে দেওয়া হয়।

পরবর্তী বছরগুলোতে এই নীতি বাস্তবে প্রয়োগের চিত্রও দেখা গেছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের প্রতি শত্রুতার ক্ষেত্রেও তা প্রাসঙ্গিক ছিল। তেহরান তাদের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানকে নৈতিক নীতি হিসেবে তুলে ধরে—পশ্চিমা আধিপত্য ও উপনিবেশবাদের বিরোধিতা করার লক্ষ্য দিয়ে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ অবস্থান তাদের জন্য সহানুভূতির জায়গা তৈরি করেছে। দেশের ভেতরে দমন-পীড়ন থাকলেও অনেকেই ইরানকে আন্তর্জাতিক প্রতিরোধের মূল স্তম্ভ হিসেবে দেখেন।

তবে ইরানের এই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান সর্বজনীন নয়—পরিস্থিতিভিত্তিক। তারা নিজেদের ওপর আধিপত্য বিস্তারকে বাধা দেয়, কিন্তু সব ধরনের আধিপত্যের বিরোধিতা করে না। ইরানের ‘অগ্রবর্তী প্রতিরক্ষা’ নীতির কারণে লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিন শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এসব অঞ্চলে প্রভাব বাড়াতে অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব উপেক্ষা করার অভিযোগও ওঠে। সেই কারণে তাদের সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা অনেক সময় সুবিধাজনকভাবে ব্যবহার করা হয়।

নিজেদের ক্ষেত্রে ইরান সার্বভৌমত্বের কথা বললেও আঞ্চলিক নীতিতে তারা অন্য দেশের স্বাধীনতাকে নিজেদের নিরাপত্তার কাছে গৌণ করে তোলে। বিশ্বরাজনীতিতেও এই ধারা একমাত্র ইরানের নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ‘বাস্তববাদী তত্ত্ব’ অনুযায়ী যেকোনো রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য হলো নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ইরানও ভিন্ন কিছু নয়—একটি সাধারণ রাষ্ট্র, যা কেবল মতাদর্শ দিয়ে নিজের সিদ্ধান্তকে আড়াল করতে চায়।

এই অবস্থানই সমঝোতার পথ তৈরি করে। ইরানের নীতি কাজ করে দুটি ধাপে। প্রথম ধাপ হলো যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বিরোধিতা এবং মিত্রদের সমর্থন দেওয়া। এরও ওপরে দ্বিতীয় ও প্রধান ধাপ রয়েছে—‘হেফজে নেজাম’ বা শাসনব্যবস্থার সুরক্ষা। ব্যবস্থার সুরক্ষার জন্য প্রথম ধাপের যেকোনো নীতি বদল করা সম্ভব। অর্থাৎ টিকে থাকাই মূল কথা; সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা কেবল একটি সুরক্ষাকবচ—প্রয়োজনে যার ঢিলও দেওয়া যায়।

ইরান মুখে আদর্শের কথা বললেও নীতি নির্ধারণ করে লাভ-ক্ষতির হিসাবে। মতাদর্শী রাষ্ট্রগুলোর জন্য এই বৈপরীত্যই সাধারণ বৈশিষ্ট্য। তাদের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো—সরাসরি আপস না দেখিয়ে কীভাবে কৌশলগত ছাড় দেওয়া যায়, তা নিশ্চিত করা। ইতিহাস দেখায়, এটি তাদের জন্য অসম্ভব নয়। ১৯৮৮ সালের জুলাই মাসে খোমেনি ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি মেনে নেন; জনসমক্ষে তিনি সেটিকে ‘বিষপানের চেয়েও তিক্ত’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। একই যুদ্ধে সাদ্দাম হোসেনের হুমকি মোকাবিলায় ইরান ইসরায়েলি মাধ্যমে মার্কিন অস্ত্র গ্রহণ করেছিল, যা ‘ইরান-কন্ট্রা কেলেঙ্কারি’ নামে পরিচিত। আবার ৯/১১ হামলার পর আফগানিস্তানে তালেবান-পরবর্তী সরকার গঠনেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান গোপনে সহযোগিতা করেছিল।

এই ঘটনাগুলোর কোনোটিই ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলপন্থী করে তোলে না। তবে এগুলো দেখায়, তাদের কঠোর নীতির ভেতর বিকল্প সুইচ আছে—‘অস্তিত্ব রক্ষা’। চলতি বছর এ কৌশল বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে পড়ে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। কয়েক দিনের মধ্যে বিশেষজ্ঞ পরিষদ তাঁর ছেলে মোজতবাকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা বানিয়ে দেয়। যদিও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের মূল নীতিতে বংশানুক্রমিক নেতৃত্বকে সমর্থন করা হয় না, তবু শাসনের অস্তিত্ব রক্ষা করতে এই নীতি ছাড় দেওয়া হয়।

গত ১৭ জুন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকে সই করেন। এতে যুদ্ধবিরতি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, অর্থ ছাড় ও পুনর্গঠন সহায়তার বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। মোজতবা খামেনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও লিখিতভাবে এটি অনুমোদন করেন। এখানেও ক্ষমতার কেন্দ্র ঠিক রাখতে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানকে ঢিলে করা হলো।

যদিও এই সমঝোতা সব সমস্যা দূর করতে পারেনি এবং পরেই লড়াই আবার শুরু হয়, তবু এর তাৎপর্য অস্বীকার করা যায় না। চরম অস্তিত্বের সংকটে পড়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি চুক্তিতে পৌঁছাতে সম্মত হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো—নিজের নীতি না হারিয়ে ইরান এ ধরনের চুক্তি কীভাবে করবে? সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা পরিত্যাগ করে নয়; বরং এর সংজ্ঞা নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে। ২০১৩ সালে আলী খামেনি ‘বীরোচিত নমনীয়তা’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছিলেন। একজন কুস্তিগির যেমন কৌশলগত কারণে পেছনে হটে, এটিও ঠিক তা-ই। ইরান ছাড় দেওয়াকে ‘কৌশলগত ধৈর্য’ এবং পিছিয়ে যাওয়াকে ‘সংগ্রাম অব্যাহত রাখা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে।

অনুসারীরাও এ যুক্তি মেনে নেয়। কারণ রাষ্ট্র যখন নিজের মতো করে মতাদর্শের ব্যাখ্যা দেয়, সমর্থকেরা তা অনুসরণ করেন। ফলে সরকার তাদের লাল রেখা পার করলেও সমর্থন হারায় না।

ইসলামি প্রজাতন্ত্র কি নিজের টিকে থাকার জন্য তার চিরশত্রুতার নীতি বিসর্জন দেবে? যাঁরা এখনো এ প্রশ্ন করছেন, তাঁদের ইরানের সংবিধানে ১৯৮৯ সালে অন্তর্ভুক্ত ১১২ অনুচ্ছেদটি আবার পড়ে দেখা দরকার। উত্তর সেখানেই আছে।

ইসলামাবাদ সমঝোতাও একই যুক্তিতে মেনে নেওয়া হয়েছে। এটাকে আত্মসমর্পণ না বলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রতিরোধের সক্ষমতা বজায় রাখা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতেও একই কৌশল দেখা গিয়েছিল। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র বা পরোক্ষভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে সমঝোতা হলেও তাকে ‘ইসলামি ব্যবস্থার বেঁচে থাকার কৌশল’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হবে বলে ধারণা করা হয়।

শত্রুর সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি যুদ্ধের ঝুঁকি কমাতে পারে এবং অর্থনৈতিক সংকটও কিছুটা লাঘব হতে পারে। সাধারণ ইরানিদের জন্য তা স্বস্তিদায়ক। তবে বিদেশি চুক্তি মানেই দেশে স্বাধীনতা আসবে—এ কথাও নিশ্চিত নয়।

যুদ্ধের অজুহাতে সরকার ইতিমধ্যে দেশে গ্রেপ্তার, বিচার ও মৃত্যুদণ্ড বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে মানুষের অর্থনৈতিক কষ্ট কিছুটা কমতে পারে, কিন্তু শাসনব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ দমননীতি যে কমবে না—এটাই মূল উদ্বেগ। বরং সরকারের হাতে দমন-পীড়ন জোরদার করার জন্য বাড়তি সম্পদ যুক্ত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। ফলে ‘সংঘাত ইরানকে ধ্বংস করবে’ এবং ‘কূটনীতি ইরানকে নমনীয় করবে’—এই দুই ধারণার বাইরে তৃতীয় একটি বাস্তবতা সামনে আসে। তা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন এক চুক্তি হতে পারে যা তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখবে, কিন্তু ইরানিদের গণতন্ত্র দেবে না। বহিরাগত আক্রমণ থেকে ইরান রক্ষা পেলেও ভেতরের জনগণের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ কমবে না।

ইসলামি প্রজাতন্ত্র কি নিজের টিকে থাকার জন্য তার চিরশত্রুতার নীতি বিসর্জন দেবে? যাঁরা এখনো এ প্রশ্ন করছেন, তাঁদের ইরানের সংবিধানে ১৯৮৯ সালে অন্তর্ভুক্ত ১১২ অনুচ্ছেদটি আবার পড়ে দেখা দরকার। উত্তর সেখানেই আছে।

  • হোসেন দাব্বাগ যুক্তরাজ্যের নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি লন্ডনের দর্শনের সহযোগী অধ্যাপক। আল–জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।