ইতালির রাজধানী রোমে ছুরিকাঘাতে নিহত নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের একই পরিবারের তিন সদস্যের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার (১০ আগস্ট) সন্ধ্যায় চরকাঁকড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের শিশু নিকেতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে তাদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি তিনজনকে দাফন করা হয়।

নিহতরা হলেন কামাল উদ্দিন বাবুল (৩৯), তার স্ত্রী আরজু আক্তার (৩৮) এবং তাদের পাঁচ বছর বয়সী শিশুসন্তান আরোয়া ইসলাম আরিশা। গত ২৬ জুন রাতে রোমের পার্শ্ববর্তী ক্যাসালোত্তি এলাকার ভিয়া মন্তিলিওর একটি বাসায় তারা ছুরিকাঘাতে খুন হন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে গুরুতর আহত হয় বাবুলের একমাত্র সন্তান অয়ন, যে পুরো পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য হিসেবে বেঁচে আছে।

শুক্রবার সকাল আটটার দিকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মরদেহগুলো পৌঁছালে স্বজনেরা তা গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান। বিকেলে ইতালি থেকে দেশে ফিরে অয়ন তার বাবা-মা ও বোনের শেষ জানাজা ও দাফনে অংশ নেয়। তিনজনের কফিন দেখে সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিহত বাবুলের বৃদ্ধ বাবা সিরাজুল ইসলাম বলেন, “আমার ছেলে ছুটিতে দেশে এসে কবরস্থানে মাটি ফেলেছিল। আজ সেখানেই তাকে স্ত্রী-সন্তানসহ দাফন দিতে হলো। আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে, আমি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।”

তদন্তে প্রধান সন্দেহভাজন এখনো পলায়নপর

এই হত্যাকাণ্ডে মো. শাহাদাত হোসেন (৪০) নামের এক ব্যক্তিকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে অভিযুক্ত করেছে ইতালির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত ২৭ জুন তার ছবি প্রকাশ করে ইতালীয় পুলিশ জানায়, রোমের এই হত্যাকাণ্ডে তাকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে ধরা হচ্ছে এবং তার তথ্যের জন্য রোম কোয়েস্টের মোবাইল টিমে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানায়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত শাহাদাত হোসেন নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব এবং চরকাঁকড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা। তবে ঘটনার দেড় মাস অতিবাহিত হলেও পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

নিহত বাবুলের চাচাতো ভাই আইনজীবী ইউনুস বলেন, “আমরা বাকরুদ্ধ। এতদিন পার হলেও পুলিশ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। আমরা চাই দ্রুত এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ উন্মোচন করে অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হোক।”

আগে থেকেই ছিল নিরাপত্তাশঙ্কা

নিহতদের স্বজনদের দাবি, ইতালির এই ঘটনার আগে থেকেই দেশে তাদের পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল। ২০২৩ সালে চরকাঁকড়া ইউনিয়নে তাদের গ্রামের বাড়ির সামনে ‘লাল বাহিনী’ নামের একটি কথিত সন্ত্রাসী বা ডাকাত দলের পক্ষ থেকে চিঠি পাওয়া যায়। সেখানে চাঁদা ও স্বর্ণালংকার দাবি করে না দিলে পরিবারের সদস্যদের হত্যাসহ নারী সদস্যদের নির্যাতনের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। সে সময় নিরাপত্তাশঙ্কায় বাবুলের বাবা সিরাজুল ইসলাম স্থানীয় থানা ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন।

এর আগে, গত ১১ আগস্ট ইতালির স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় রোমের ক্যাসালোত্তি এলাকার পিয়াজ্জা ওর্মেয়ায় নিহতদের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো বাংলাদেশে পাঠায় ইতালি পুলিশ। বর্তমানে ইতালীয় পুলিশ ঘটনার মোটিভ উদ্ধারে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।